দীর্ঘ ২৫ বছরেও শেষ হয়নি বিচার: বানিয়ারচর গীর্জা বোমা হামলায় নিহতদের স্বজনদের অপেক্ষা এখনো শেষ হয়নি
বানিয়ারচর গীর্জা বোমা হামলা ট্রাজেডির ২৫ বছর পূর্তি আজ
আজ ৩ জুন, গোপালগঞ্জের মুকসুদপুর উপজেলার বানিয়ারচর গীর্জা বোমা হামলা ট্রাজেডির ২৫ বছর পূর্তির দিন। ২০০১ সালের এই দিনে প্রার্থনায় অংশ নিতে আসা খ্রিষ্টভক্তদের ওপর চালানো হয় ভয়াবহ বোমা হামলা। সেই হামলায় প্রাণ হারান ১০ জন এবং আহত হন অর্ধশতাধিক মানুষ। সময়ের হিসেবে পেরিয়ে গেছে আড়াই দশক, কিন্তু এখনো শেষ হয়নি এই আলোচিত হত্যাকাণ্ডের বিচার প্রক্রিয়া। ফলে নিহতদের স্বজন ও এলাকাবাসীর মধ্যে ক্ষোভ, হতাশা ও বিচারহীনতার বেদনা আরও গভীর হয়েছে।

গির্জায় বোমা হামলায় নিহত হন রক্সিড জেত্রা, বিনোদ দাস, মন্মথ সিকাদার, সঞ্জীবন বাড়ৈ, পিটার সাহা, অমর বিশ্বাস, সতীশ বিশ্বাস, ঝিন্টু মন্ডল, মাইকেল মল্লিক ও সুমন হালদার।
২০০১ সালের ৩ জুন ছিল একটি সাধারণ প্রার্থনার দিন। স্থানীয় খ্রিষ্টভক্ত বানিয়ারচর গীর্জায় জড়ো হয়েছিলেন রবিবারের খ্রিষ্টযাগে অংশ নিতে। কিন্তু মুহূর্তেই সেই পরিবেশ রূপ নেয় বিভীষিকায়। গীর্জার ভেতরে শক্তিশালী বোমা বিস্ফোরণে ঘটনাস্থলেই কয়েকজন নিহত হন। পরে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় আরও কয়েকজনের মৃত্যু হয়। আহতদের অনেকেই দীর্ঘদিন শারীরিক ও মানসিক যন্ত্রণার মধ্যে জীবন কাটিয়েছেন।
ঘটনার ভয়াবহতা আজও ভুলতে পারেননি প্রত্যক্ষদর্শী ও নিহত পরিবারের সদস্যরা। স্বজনদের ভাষ্য, প্রতিটি ৩ জুন ফিরে আসে ভয়, আতঙ্ক আর অপূর্ণ বিচারের স্মৃতি নিয়ে। সন্তান, বাবা, মা কিংবা পরিবারের সদস্য হারানোর ক্ষত এখনো শুকায়নি। তাদের অনেকেই দীর্ঘদিন ধরে আদালতের রায়ের অপেক্ষা করেছেন। কিন্তু বিচার শেষ হওয়ার আগেই অনেকে পৃথিবী ছেড়ে চলে গেছেন।
নিহতদের পরিবারের সদস্যরা অভিযোগ করে বলেন, এত বড় একটি নৃশংস হামলার ঘটনায় দীর্ঘ সময় পার হলেও বিচার কার্যকরভাবে এগোয়নি। এতে রাষ্ট্রের বিচার ব্যবস্থার ওপর তাদের আস্থা দুর্বল হয়েছে। তারা দ্রুত বিচার সম্পন্ন করে দোষীদের শাস্তি নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন।

এ ঘটনায় দায়ের করা দুটি মামলায় নিষিদ্ধ জঙ্গি সংগঠনের নেতা মুফতি আব্দুল হান্নান মুন্সীসহ মোট ২৩ জনকে আসামি করা হয়। দীর্ঘ তদন্ত শেষে সিআইডি মামলার তদন্ত কার্যক্রম সম্পন্ন করে। তবে অন্য একটি মামলায় মুফতি আব্দুল হান্নানের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়ায় তাকে বাদ দিয়ে ২০২১ সালে আদালতে অভিযোগপত্র (চার্জশিট) জমা দেওয়া হয়।
তবে চার্জশিট দাখিলের কয়েক বছর পেরিয়ে গেলেও এখনো আদালতে বিচার কাজ শুরু হয়নি বলে জানা গেছে। ফলে মামলার ভবিষ্যৎ নিয়ে হতাশা তৈরি হয়েছে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবার ও স্থানীয়দের মধ্যে। তারা মনে করছেন, বিচার প্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতা শুধু স্বজনদের কষ্টই বাড়াচ্ছে।
স্থানীয় বাসিন্দারা বলেন, এত বড় একটি ঘটনার বিচার দীর্ঘদিন ঝুলে থাকা উদ্বেগের বিষয়। তারা দ্রুত মামলার শুনানি শুরু করে রায় ঘোষণার দাবি জানান। তাদের মতে, বিচার সম্পন্ন হলে শুধু নিহত পরিবারের সদস্যরাই নয়, পুরো এলাকার মানুষের দীর্ঘদিনের অপেক্ষার অবসান ঘটবে।
৩জুন বানিয়ারচর গির্জা ট্রাজেডি দিবস উপলক্ষে বানিয়ারচর গীর্জায় বিশেষ প্রার্থনা, শোকসভা এবং নিহতদের স্মরণে বিভিন্ন কর্মসূচি পালনের উদ্যোগ নিয়েছে গীর্জা কর্তৃপক্ষ। নিহতদের আত্মার শান্তি কামনার পাশাপাশি দ্রুত বিচার সম্পন্নের দাবিও জানানো হবে এসব কর্মসূচি থেকে।
দীর্ঘ সময় পার হলেও বানিয়ারচরের মানুষ এখনো অপেক্ষায়-কবে শেষ হবে বিচার, কবে মিলবে সেই দিনের রক্তাক্ত স্মৃতির ন্যায্য উত্তর।
তথ্য: স্থানীয় জনগণ, দৈনিক মোহনা

















