আজ বিশ্ব শরণার্থী দিবস
অনিশ্চিত প্রত্যাবাসনের ‘গোলকধাঁধায়’ রোহিঙ্গারা
আজ ২০ জুন বিশ্বব্যাপী পালিত হচ্ছে বিশ্ব শরণার্থী দিবস। বিশ্বে নানা সময়ে নানা স্থানে সংগঠিত যুদ্ধ, সংঘাত ও নিপীড়নের কারণে বাস্তুচ্যুত মানুষদের সাহস সঞ্চার ও ঘুরে দাঁড়াতে সহায়তা করে সম্মান জানাতে জাতিসংঘ ২০০১ খ্রিষ্টাব্দে এই দিনটি নির্ধারণ করে।
এই বছর দিবসটির প্রতিপাদ্য হলো “যতক্ষণ না সবাই নিরাপদ, ততক্ষণ আমাদের কাজ শেষ নয়”।
১৯৫১ খ্রিষ্টাব্দে জাতিসংঘ শরণার্থীদের সুরক্ষার জন্য শরণার্থী কনভেনশন গ্রহণ করে। এরপর ২০০০ খ্রিষ্টাব্দে জাতিসংঘ সিদ্ধান্ত নেয় যে প্রতি বছর ২০ জুন বিশ্ব শরণার্থী দিবস হিসেবে পালিত হবে। এর পরের বছর অর্থাৎ ২০০১ খ্রিষ্টাব্দ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে এই দিবস বিশ্বজুড়ে পালিত হচ্ছে। বর্তমানে বিশ্বে শরণার্থী সংখ্যা ৪ কোটিও বেশি।
ক্যালেন্ডারের পাতায় দিনটি প্রতিবছর আসে, কিন্তু কক্সবাজারের টেকনাফ ও উখিয়ার আশ্রয়শিবিরগুলোয় বসবাসকারী ১৪ লাখ রোহিঙ্গার জীবনে এই দিনটি কোনো নতুন আশার বার্তা নিয়ে আসে না। বরং খাদ্যসহায়তার টানাপোড়েন ও অনিশ্চিত প্রত্যাবাসনের ‘গোলকধাঁধায়’ স্বজন হারানো আর জন্মভূমি ছাড়ার স্মৃতিগুলো এই দিনে আরও প্রকট হয়ে ওঠে।
উখিয়ার লম্বাশিয়া, কুতুপালং, বালুখালী, মধুরছড়া, টেকনাফের নয়াপাড়া, শালবাগান, জাদিমুরা আশ্রয়শিবির ঘুরে রোহিঙ্গাদের মুখে কেবল শোনা যায় হতাশার কথা।
বর্তমানে কক্সবাজারের টেকনাফ ও উখিয়ার ৩৩টি আশ্রয়শিবিরে নিবন্ধিত রোহিঙ্গার সংখ্যা ১৪ লাখের বেশি। এর মধ্যে ৮ লাখ এসেছে ২০১৭ সালের ২৫ আগস্টের পরের কয়েক মাসে। গত ৯ বছরে একজন রোহিঙ্গাও মিয়ানমারে ফেরত পাঠানো সম্ভব হয়নি। উল্টো গত দেড় বছরে রাখাইন রাজ্য থেকে আরাকান আর্মির অত্যাচার–নির্যাতনের শিকার হয়ে আশ্রয়শিবিরে পালিয়ে আসে আরও ১ লাখ ৫২ হাজার রোহিঙ্গা।
শরণার্থী এই শিবিরের খাদ্যসহায়তা সংকট সহ সবচেয়ে করুণ চিত্রটি ফুটে উঠে সম্ভবত শিশুদের। প্রায় ছয় লাখ শিশু-কিশোর এখানে বেড়ে উঠছে কোনো খেলার মাঠ, পার্ক কিংবা শিক্ষার সুযোগ ছাড়াই। ক্যাম্পের ঘিঞ্জি পরিবেশে তাদের মানসিক বিকাশ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। অপুষ্টির কারণে শিশুদের বড় একটি অংশ স্বাস্থ্যঝুঁকির মুখে রয়েছে।
প্রত্যাবাসন নিয়ে কূটনৈতিক তৎপরতা চললেও মাঠপর্যায়ে এর কোনো প্রতিফলন নেই উল্লেখ করে আরাকান রোহিঙ্গা সোসাইটি ফর পিস অ্যান্ড হিউম্যান রাইটসের (এআরএইচপিএস) চেয়ারম্যান মোহাম্মদ জুবায়ের বলেন, প্রত্যাবাসন বিলম্বিত হওয়ার নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে।
রোহিঙ্গা নেতারা বলেন, রোহিঙ্গাদের ওপর চালানো মিয়ানমার জান্তার গণহত্যা ও মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার এখন আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে ( আইসিজে) বিচারাধীন। মামলার প্রতিটি শুনানি রোহিঙ্গাদের মনে কিছুটা আশার আলো জ্বালালেও, মাঠপর্যায়ে এর কোনো দৃশ্যমান প্রভাব নেই।
এই আশ্রয়কেন্দ্রের পরিবেশ দিন দিন বসবাসের অযোগ্য হয়ে পড়ছে উল্লেখ করে কুতুপালং আশ্রয়শিবিরের রোহিঙ্গা নেতা জালাল আহমদ বলেন, বর্ষাকালে পাহাড়ধস এবং শুষ্ক মৌসুমে আগুনের আতঙ্ক নিয়ে বসবাস করতে হচ্ছে।’
রোহিঙ্গা নেতাদের ভাষ্য, শিবিরের অনিশ্চিত জীবন থেকে মুক্তি পেতে রোহিঙ্গারা বেছে নিচ্ছে জীবনের সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ পথ-সমুদ্র। আদম পাচারকারী চক্রগুলোর প্রলোভনে পড়ে বা স্বেচ্ছায় জীবনের ঝুঁকি নিয়ে মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া বা মধ্যপ্রাচ্যের দেশে পাড়ি জমাচ্ছেন শত শত রোহিঙ্গা।
সূত্র : প্রথম আলো













