Dhaka , সোমবার, ১৯ অক্টোবর ২০২৬, ৪ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
শিরোনাম :
হাসপাতাল থেকে ছাড়া পেয়ে ভ্যাটিকানে ফিরেছেন পোপ লিও চতুর্দশ ইসরায়েলের নির্বাচনে ‘কিংমেকার’ কে এই আব্বাস, নেতানিয়াহুকেও সরিয়েছিলেন তিনি ‘বিস্ফোরণের বিকট শব্দ শুনে ছুটে এসে দেখি, রিসোর্টটি দাউ দাউ করে জ্বলছে’ রিসোর্টের দোতলা থেকে লাফ দিয়ে বাঁচলেন আশিকুল, পুড়ে মারা গেলেন স্ত্রীসহ পরিবারের ৬ জন কক্সবাজারে রিসোর্টে আগুন, চারজনের মরদেহ উদ্ধার, আহত কয়েকজন হাসপাতালে যুব ফুটবল টুর্নামেন্ট ২০২৬-এর প্রথম সেমিফাইনালে ধরেন্ডা যুব কল্যাণ সংঘের জয় ৭৮তম আন্তর্জাতিক ক্রেডিট ইউনিয়ন দিবস-২০২৬ উপলক্ষে কালবের উদ্যোগে বিশেষ আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত রোনালদোর পর্তুগাল দলে না ফেরার সম্ভাবনা দেখছেন তাঁর বোন অস্ত্রোপচারের পর সুস্থ হয়ে উঠছেন পোপ চতুর্দশ লিও টঙ্গীতে ওষুধ কারখানার আগুন চার ঘণ্টা পর নিয়ন্ত্রণে

ইসরায়েলের নির্বাচনে ‘কিংমেকার’ কে এই আব্বাস, নেতানিয়াহুকেও সরিয়েছিলেন তিনি

রিপোর্ট: নীড় সংবাদ ডেস্ক

ইসরায়েলের আসন্ন নির্বাচনের প্রচারণাগুলোর ওপর নজর রাখলেই যেকোনো সাধারণ মানুষের মনে হতে পারে দেশটির ভবিষ্যতের জন্য সবচেয়ে বড় হুমকি মনসুর আব্বাস। প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহুর নির্বাচনী প্রচারণায় তাঁকে সেভাবেই তুলে ধরা হচ্ছে।

মনসুর আব্বাস ইসরায়েলের ‘ইউনাইটেড আরব লিস্ট’ বা ‘রাম’ নামে ইসলামপন্থী একটি রাজনৈতিক দলের নেতা। নেতানিয়াহু নির্বাচনী প্রচারণায় ইহুদি ভোটারদের সতর্ক করে বলছেন, তিনি ক্ষমতাচ্যুত হলে পরবর্তী সরকারের আসল ক্ষমতার চাবিকাঠি থাকবে মনসুর আব্বাসের হাতে, যা ইসরায়েলের জন্য ‘ঘরের ভেতরের’ বিপদ। ডানপন্থী ইসরায়েলিরা যাঁকে সবচেয়ে বেশি ভয় পান, সেই ফিলিস্তিন রাষ্ট্র গঠনের পেছনে প্রধান চালিকা শক্তি এই মনসুর আব্বাস।

বাস্তবতা হলো, নির্বাচনে মনসুর আব্বাসের ঘোষিত অগ্রাধিকারগুলোর সঙ্গে ফিলিস্তিনের পশ্চিম তীর এবং গাজার সম্পর্ক সামান্যই। বরং তাঁর পুরো মনোযোগ ইসরায়েলের আরব নাগরিকদের ওপর। ইসরায়েলের জনসংখ্যার প্রায় ২০ শতাংশই ইসরায়েলি আরব। ইসরায়েলের কট্টরপন্থী ইহুদিদের সহিংস অপরাধ ও বৈষম্যমূলক আবাসন নীতির ভুক্তভোগী এই নাগরিকেরা।

মনসুর আব্বাসের বিরুদ্ধে নেতানিয়াহুর আক্রমণাত্মক প্রচারণার একটি বিষয়কে বিশেষভাবে গুরুত্ববহ করে তোলে। সেটা হলো, আসন্ন নির্বাচনে মনসুর আব্বাসই শেষ পর্যন্ত ‘কিংমেকার’ বা সরকার গঠনের নিয়ামক হয়ে উঠতে পারেন। এর আগেও তিনি এই ভূমিকা পালন করেছেন। ইসরায়েলের বহুদলীয় রাজনৈতিক ব্যবস্থায় নেতানিয়াহুর বিরোধী জোট যদি মনসুর আব্বাসের সমর্থন না নেন, তবে তাঁকে ক্ষমতাচ্যুত করার মতো যথেষ্ট বড় জোট গঠন করতে পারবে না।

বিষয়টি মনসুর আব্বাসকে সম্ভবত ইসরায়েলের ইতিহাসের সবচেয়ে প্রভাবশালী আরব রাজনীতিবিদ করে তুলেছে। বিষয়টি আরও অভাবনীয় এই কারণে যে ১৯৯৬ সালে ইসরায়েলের ইসলামিক মুভমেন্টের একটি শাখার হাত ধরে গঠিত ‘রাম’ একটি সামাজিকভাবে রক্ষণশীল দল, যা ইসরায়েলি ইহুদি দলগুলোর সঙ্গে জোট বাঁধার ক্ষেত্রে এক অদ্ভুত মেলবন্ধন তৈরি করে। রাম ইসরায়েলে মুসলিম পরিচয়কে শক্তিশালী করতে এবং আরব সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীকে ক্ষমতায়িত করতে কাজ করে।

এক সাক্ষাৎকারে মনসুর আব্বাস জানিয়েছেন, নেতানিয়াহুর বর্ণবাদী, ফ্যাসিবাদী সরকারকে পতন ঘটাতে চান তিনি। পাশাপাশি এমন এক সরকার প্রতিষ্ঠায় সহযোগী হতে চান, যে সরকারের অংশীদার হবেন আরব নাগরিকেরা। তিনি বলেন, ‘এমন সরকার প্রতিষ্ঠা করতে চাই, যেখানে আমাদের কথা বলার সুযোগ থাকবে, আমাদের প্রভাব থাকবে।’

মনসুর আব্বাস ইসরায়েলের উত্তরাঞ্চলের বেদুইন শহর তুবা-জাঙ্গারিয়ার এক জনসভায় শত শত ভোটারের উদ্দেশে বক্তৃতায় আশ্বাস দেন, ‘ক্ষমতাবানদের টেবিলে আমরা আর অনাথ হয়ে থাকব না।’ সেই বক্তৃতায় তিনি আরব ও ইহুদিদের মধ্যে অংশীদারত্বের প্রয়োজনীয়তার ওপর গুরুত্বের কথা তুলে ধরেন।

কেউ কেউ অবশ্য মনসুর আব্বাসকে দেশের সবচেয়ে কৌশলী রাজনীতিবিদ বলে থাকেন। ২০২১ সালে মনসুর আব্বাস প্রথমবার সবার নজর কাড়েন সেই সময় নেতানিয়াহুর নতুন সরকারে যোগ দেওয়ার জন্য তাঁর সঙ্গে আলোচনা চালানোয়। এটা ছিল একটি ইসলামপন্থী দলের জন্য ঐতিহাসিক মাইলফলক। তবে শেষ পর্যন্ত নেতানিয়াহুকে সরানোর জন্য বিরোধীদের সঙ্গে জোট বাঁধেন আব্বাস। এতে পতন ঘটে নেতানিয়াহু সরকারের। টানা ১২ বছর পর প্রধানমন্ত্রিত্ব হারান নেতানিয়াহু।

যদিও পরের বছরই নির্বাচনে জিতে নেতানিয়াহু আবার প্রধানমন্ত্রীর পদ পুনরুদ্ধার করেন। এবার নেতানিয়াহু ইসরায়েলের ইতিহাসের সবচেয়ে কট্টর ইহুদিবাদী সরকার গঠন করেন। এরপর যখন ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর ফিলিস্তিনি সংগঠন হামাস ইসরায়েলে ঢুকে প্রায় ১ হাজার ২০০ জনকে হত্যা করে এবং প্রায় ২৫০ জনকে জিম্মি করে নিয়ে যায়, তখন থেকে অনেক ইসরায়েলিই ইসরায়েলের আরব নাগরিকসহ সব ফিলিস্তিনিকে সম্ভাব্য হুমকি হিসেবে দেখা শুরু করেন।৫২ বছর বয়সী মনসুর আব্বাস হামাসের এই হামলার পর ইসরায়েলি ইহুদিদের কাছে পৌঁছানো এবং তাঁদের গ্রহণযোগ্যতা অর্জনের প্রচেষ্টা আরও বাড়িয়ে দেন। তিনি ৭ অক্টোবরের হামলার দিনই সেই হত্যাকাণ্ডের তীব্র নিন্দা জানান। পাশাপাশি গাজা সীমান্ত এলাকা থেকে পালিয়ে আসা ইসরায়েলিদের আবাসনের ব্যবস্থা করতে সাহায্য করেন। তিনি বারবার হামাসের এই হামলার নিন্দা করেছেন এবং বলেছেন, সহিংসতা কেবল ফিলিস্তিনিদেরই ক্ষতি করেছে।

তবু ২৭ অক্টোবরের নির্বাচন যত এগিয়ে আসছে, মনসুর আব্বাস ততই আক্রমণের শিকার হচ্ছেন। নেতানিয়াহু ও তাঁর সহযোগীরা মনসুর আব্বাসকে সন্ত্রাসীদের প্রতি সহানুভূতিশীল বা তার চেয়েও খারাপ কিছু হিসেবে চিত্রায়িত করছেন।

Tag :

Please Share This Post in Your Social Media

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information
Update Time : ০৮:১৬ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ১৮ অক্টোবর ২০২৬

ইসরায়েলের নির্বাচনে ‘কিংমেকার’ কে এই আব্বাস, নেতানিয়াহুকেও সরিয়েছিলেন তিনি

Update Time : ০৮:১৬ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ১৮ অক্টোবর ২০২৬

ইসরায়েলের আসন্ন নির্বাচনের প্রচারণাগুলোর ওপর নজর রাখলেই যেকোনো সাধারণ মানুষের মনে হতে পারে দেশটির ভবিষ্যতের জন্য সবচেয়ে বড় হুমকি মনসুর আব্বাস। প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহুর নির্বাচনী প্রচারণায় তাঁকে সেভাবেই তুলে ধরা হচ্ছে।

মনসুর আব্বাস ইসরায়েলের ‘ইউনাইটেড আরব লিস্ট’ বা ‘রাম’ নামে ইসলামপন্থী একটি রাজনৈতিক দলের নেতা। নেতানিয়াহু নির্বাচনী প্রচারণায় ইহুদি ভোটারদের সতর্ক করে বলছেন, তিনি ক্ষমতাচ্যুত হলে পরবর্তী সরকারের আসল ক্ষমতার চাবিকাঠি থাকবে মনসুর আব্বাসের হাতে, যা ইসরায়েলের জন্য ‘ঘরের ভেতরের’ বিপদ। ডানপন্থী ইসরায়েলিরা যাঁকে সবচেয়ে বেশি ভয় পান, সেই ফিলিস্তিন রাষ্ট্র গঠনের পেছনে প্রধান চালিকা শক্তি এই মনসুর আব্বাস।

বাস্তবতা হলো, নির্বাচনে মনসুর আব্বাসের ঘোষিত অগ্রাধিকারগুলোর সঙ্গে ফিলিস্তিনের পশ্চিম তীর এবং গাজার সম্পর্ক সামান্যই। বরং তাঁর পুরো মনোযোগ ইসরায়েলের আরব নাগরিকদের ওপর। ইসরায়েলের জনসংখ্যার প্রায় ২০ শতাংশই ইসরায়েলি আরব। ইসরায়েলের কট্টরপন্থী ইহুদিদের সহিংস অপরাধ ও বৈষম্যমূলক আবাসন নীতির ভুক্তভোগী এই নাগরিকেরা।

মনসুর আব্বাসের বিরুদ্ধে নেতানিয়াহুর আক্রমণাত্মক প্রচারণার একটি বিষয়কে বিশেষভাবে গুরুত্ববহ করে তোলে। সেটা হলো, আসন্ন নির্বাচনে মনসুর আব্বাসই শেষ পর্যন্ত ‘কিংমেকার’ বা সরকার গঠনের নিয়ামক হয়ে উঠতে পারেন। এর আগেও তিনি এই ভূমিকা পালন করেছেন। ইসরায়েলের বহুদলীয় রাজনৈতিক ব্যবস্থায় নেতানিয়াহুর বিরোধী জোট যদি মনসুর আব্বাসের সমর্থন না নেন, তবে তাঁকে ক্ষমতাচ্যুত করার মতো যথেষ্ট বড় জোট গঠন করতে পারবে না।

বিষয়টি মনসুর আব্বাসকে সম্ভবত ইসরায়েলের ইতিহাসের সবচেয়ে প্রভাবশালী আরব রাজনীতিবিদ করে তুলেছে। বিষয়টি আরও অভাবনীয় এই কারণে যে ১৯৯৬ সালে ইসরায়েলের ইসলামিক মুভমেন্টের একটি শাখার হাত ধরে গঠিত ‘রাম’ একটি সামাজিকভাবে রক্ষণশীল দল, যা ইসরায়েলি ইহুদি দলগুলোর সঙ্গে জোট বাঁধার ক্ষেত্রে এক অদ্ভুত মেলবন্ধন তৈরি করে। রাম ইসরায়েলে মুসলিম পরিচয়কে শক্তিশালী করতে এবং আরব সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীকে ক্ষমতায়িত করতে কাজ করে।

এক সাক্ষাৎকারে মনসুর আব্বাস জানিয়েছেন, নেতানিয়াহুর বর্ণবাদী, ফ্যাসিবাদী সরকারকে পতন ঘটাতে চান তিনি। পাশাপাশি এমন এক সরকার প্রতিষ্ঠায় সহযোগী হতে চান, যে সরকারের অংশীদার হবেন আরব নাগরিকেরা। তিনি বলেন, ‘এমন সরকার প্রতিষ্ঠা করতে চাই, যেখানে আমাদের কথা বলার সুযোগ থাকবে, আমাদের প্রভাব থাকবে।’

মনসুর আব্বাস ইসরায়েলের উত্তরাঞ্চলের বেদুইন শহর তুবা-জাঙ্গারিয়ার এক জনসভায় শত শত ভোটারের উদ্দেশে বক্তৃতায় আশ্বাস দেন, ‘ক্ষমতাবানদের টেবিলে আমরা আর অনাথ হয়ে থাকব না।’ সেই বক্তৃতায় তিনি আরব ও ইহুদিদের মধ্যে অংশীদারত্বের প্রয়োজনীয়তার ওপর গুরুত্বের কথা তুলে ধরেন।

কেউ কেউ অবশ্য মনসুর আব্বাসকে দেশের সবচেয়ে কৌশলী রাজনীতিবিদ বলে থাকেন। ২০২১ সালে মনসুর আব্বাস প্রথমবার সবার নজর কাড়েন সেই সময় নেতানিয়াহুর নতুন সরকারে যোগ দেওয়ার জন্য তাঁর সঙ্গে আলোচনা চালানোয়। এটা ছিল একটি ইসলামপন্থী দলের জন্য ঐতিহাসিক মাইলফলক। তবে শেষ পর্যন্ত নেতানিয়াহুকে সরানোর জন্য বিরোধীদের সঙ্গে জোট বাঁধেন আব্বাস। এতে পতন ঘটে নেতানিয়াহু সরকারের। টানা ১২ বছর পর প্রধানমন্ত্রিত্ব হারান নেতানিয়াহু।

যদিও পরের বছরই নির্বাচনে জিতে নেতানিয়াহু আবার প্রধানমন্ত্রীর পদ পুনরুদ্ধার করেন। এবার নেতানিয়াহু ইসরায়েলের ইতিহাসের সবচেয়ে কট্টর ইহুদিবাদী সরকার গঠন করেন। এরপর যখন ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর ফিলিস্তিনি সংগঠন হামাস ইসরায়েলে ঢুকে প্রায় ১ হাজার ২০০ জনকে হত্যা করে এবং প্রায় ২৫০ জনকে জিম্মি করে নিয়ে যায়, তখন থেকে অনেক ইসরায়েলিই ইসরায়েলের আরব নাগরিকসহ সব ফিলিস্তিনিকে সম্ভাব্য হুমকি হিসেবে দেখা শুরু করেন।৫২ বছর বয়সী মনসুর আব্বাস হামাসের এই হামলার পর ইসরায়েলি ইহুদিদের কাছে পৌঁছানো এবং তাঁদের গ্রহণযোগ্যতা অর্জনের প্রচেষ্টা আরও বাড়িয়ে দেন। তিনি ৭ অক্টোবরের হামলার দিনই সেই হত্যাকাণ্ডের তীব্র নিন্দা জানান। পাশাপাশি গাজা সীমান্ত এলাকা থেকে পালিয়ে আসা ইসরায়েলিদের আবাসনের ব্যবস্থা করতে সাহায্য করেন। তিনি বারবার হামাসের এই হামলার নিন্দা করেছেন এবং বলেছেন, সহিংসতা কেবল ফিলিস্তিনিদেরই ক্ষতি করেছে।

তবু ২৭ অক্টোবরের নির্বাচন যত এগিয়ে আসছে, মনসুর আব্বাস ততই আক্রমণের শিকার হচ্ছেন। নেতানিয়াহু ও তাঁর সহযোগীরা মনসুর আব্বাসকে সন্ত্রাসীদের প্রতি সহানুভূতিশীল বা তার চেয়েও খারাপ কিছু হিসেবে চিত্রায়িত করছেন।