দুর্গোৎসবে উৎসবমুখর ঢাকা, পূজামণ্ডপে ভক্ত-দর্শনার্থীদের ঢল
সনাতন ধর্মাবলম্বীদের অন্যতম বৃহৎ ধর্মীয় উৎসব শারদীয় দুর্গাপূজাকে ঘিরে উৎসবমুখর হয়ে উঠেছে রাজধানী ঢাকা। বর্ণিল সাজসজ্জা, আলোকসজ্জা, ঢাকের বাদ্য আর শঙ্খধ্বনিতে মুখরিত বিভিন্ন পূজামণ্ডপে ভক্ত ও দর্শনার্থীদের উপচে পড়া ভিড় দেখা গেছে। ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের পাশাপাশি পরিবার-পরিজন ও বন্ধুদের নিয়ে মণ্ডপে মণ্ডপে ঘুরে উৎসব উপভোগ করছেন নানা বয়সী মানুষ।
গত ১৬ অক্টোবর মহাষষ্ঠীর মধ্য দিয়ে শুরু হওয়া ছয় দিনব্যাপী দুর্গোৎসবের আজ মহানবমী। আগামীকাল বুধবার, ২১ অক্টোবর বিজয়া দশমীতে প্রতিমা বিসর্জনের মধ্য দিয়ে এবারের দুর্গাপূজার আনুষ্ঠানিক সমাপ্তি ঘটবে। বাংলাদেশ পূজা উদযাপন পরিষদের তথ্য অনুযায়ী, এ বছর সারা দেশে ৩৩ হাজার ৮৫১টি পূজামণ্ডপে দুর্গাপূজা অনুষ্ঠিত হচ্ছে। এর মধ্যে রাজধানী ঢাকায় রয়েছে ২৫৮টি মণ্ডপ।

দুর্গাপূজার ধর্মীয় তাৎপর্য
হিন্দুধর্মীয় বিশ্বাস অনুযায়ী, দেবী দুর্গা অশুভ শক্তির বিনাশ এবং শুভশক্তির প্রতিষ্ঠার প্রতীক। মহিষাসুরের বিরুদ্ধে দেবী দুর্গার বিজয় ন্যায়, সত্য ও কল্যাণের জয় এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিরোধের বার্তা বহন করে।
দুর্গাপূজা শুধু ধর্মীয় উপাসনার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বাঙালির ঐতিহ্য, সংস্কৃতি ও সামাজিক সম্প্রীতির সঙ্গেও এর গভীর সম্পর্ক রয়েছে। পূজার দিনগুলোতে মণ্ডপে মণ্ডপে অঞ্জলি, আরতি, প্রসাদ বিতরণ ও বিভিন্ন সাংস্কৃতিক আয়োজনের মধ্য দিয়ে উৎসবের আনন্দ ছড়িয়ে পড়ে।
ঢাকার পূজামণ্ডপে মানুষের ঢল
মহানবমী উপলক্ষে রাজধানীর বিভিন্ন পূজামণ্ডপে সকাল থেকেই ভক্ত ও দর্শনার্থীদের উপস্থিতি ছিল চোখে পড়ার মতো। বিশেষ করে পুরান ঢাকার তাঁতীবাজার ও শাঁখারীবাজারসহ ঢাকেশ্বরী জাতীয় মন্দির, রমনা কালীমন্দির, কলাবাগান ও বনানীর পূজামণ্ডপগুলোতে উৎসবের আমেজ বিরাজ করছে।
মণ্ডপগুলোতে দেবী দুর্গার প্রতিমা দর্শন, পূজা-অর্চনা ও প্রার্থনার পাশাপাশি আলোকসজ্জা এবং নান্দনিক মণ্ডপসজ্জা দর্শনার্থীদের আকর্ষণ করছে। শিশু-কিশোর থেকে শুরু করে প্রবীণদের উপস্থিতিতে মুখর হয়ে উঠেছে বিভিন্ন পূজাপ্রাঙ্গণ। উৎসবকে কেন্দ্র করে মণ্ডপসংলগ্ন এলাকায় অস্থায়ী দোকানপাটও বসেছে।

পূজামণ্ডপ পরিদর্শনে প্রধানমন্ত্রী
শারদীয় দুর্গোৎসব উপলক্ষে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের শুভেচ্ছা জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। গত ১৯ অক্টোবর রাজধানীর ঢাকেশ্বরী জাতীয় মন্দির পরিদর্শন করে তিনি হিন্দু সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিদের সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময় করেন। এ সময় তিনি সব ধর্মের মানুষের সমান অধিকার, নিরাপত্তা ও পারস্পরিক শ্রদ্ধার ভিত্তিতে দেশ গড়ার আহ্বান জানান।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ধর্মীয় পরিচয় ভিন্ন হলেও দেশের সব নাগরিকের অধিকার ও মর্যাদা সমান। সবাইকে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে দেশের উন্নয়ন ও পুনর্গঠনে কাজ করতে হবে। এর আগে ১৬ অক্টোবর দুর্গাপূজা উপলক্ষে দেওয়া শুভেচ্ছাবার্তায় তিনি অশুভ শক্তির বিনাশ এবং সত্য ও সুন্দরের আরাধনার তাৎপর্য তুলে ধরেন।
এদিকে, শারদীয় দুর্গাপূজার মহানবমী উপলক্ষে মঙ্গলবার (২০ অক্টোবর) সকালে রাজধানীর তেজগাঁও বিমানবন্দর থেকে সামরিক বিমানে রংপুর, রাজশাহী ও চট্টগ্রাম সফরে রওনা হন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। সফরের অংশ হিসেবে তিনি রংপুরের রাধা গোবিন্দ মন্দিরের পূজামণ্ডপ পরিদর্শন করে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময় করেন। পরে রাজশাহীতে পৌঁছে জনসভায় অংশ নেওয়া এবং ধর্মসভা মন্দিরের পূজামণ্ডপ পরিদর্শনের কর্মসূচি রয়েছে তাঁর। এরপর চট্টগ্রামের রহমতগঞ্জের জে এম সেন হল পূজামণ্ডপ পরিদর্শন করে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময় করেন প্রধানমন্ত্রী। সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, ‘ধর্ম যার যার, নিরাপত্তা পাওয়ার অধিকার সবার’—এই নীতির ভিত্তিতে দেশজুড়ে দুর্গাপূজা শান্তিপূর্ণভাবে উদ্যাপনে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
সম্প্রীতি ও নিরাপদ উৎসবের প্রত্যাশা
দুর্গোৎসবকে কেন্দ্র করে দেশের বিভিন্ন ধর্মের মানুষের মধ্যে পারস্পরিক সৌহার্দ্য ও সম্প্রীতির বন্ধন আরও সুদৃঢ় হওয়ার প্রত্যাশা করা হচ্ছে। ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে মানুষের অংশগ্রহণ বাংলাদেশের বহুত্ববাদী সমাজ ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের পরিচয় বহন করে।
উৎসবের শেষ পর্যায়ে মহানবমীর ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান শেষে আগামীকাল বিজয়া দশমীতে দেবী দুর্গার বিদায় ও প্রতিমা বিসর্জনের মধ্য দিয়ে শেষ হবে এবারের শারদীয় দুর্গোৎসব। ভক্তদের প্রত্যাশা, শান্তিপূর্ণ ও আনন্দঘন পরিবেশে সম্পন্ন হবে দুর্গাপূজার বাকি আনুষ্ঠানিকতা।
সূত্র: বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা (বাসস), বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম ও অন্যান্য প্রকাশিত সংবাদ।






















