ট্রাংক কেটে প্রশ্নপত্র চুরি, কর্মকর্তার চেম্বারে বসে ফটোকপি, অন্তর্বাসে করে পাচার
‘ওই সিমে ব্যালেন্স শেষ। আব্বু মেসেজ দাও, সবাইকে উঠাইতাছি। তুমি টাকা রাখছো কারো?’ উত্তরে অপর প্রান্ত থেকে বলা হয়, ‘বৃষ্টি পড়ে, ফ্রি হয়ে কথা বলব। এখনো পর্যন্ত কয়জন নিছো?’ জবাব আসে, ‘এখন ৫০ জন ক্লিয়ার হয়ে যাবে।’
এমন কথোপকথন বাংলাদেশ সরকারি কর্ম কমিশনের (পিএসসি) সাবেক গাড়িচালক সৈয়দ আবেদ আলী ও তাঁর ছেলে সৈয়দ সোহানুর রহমান সিয়ামের।
এই চক্রের আরেক সদস্যের পাঠানো খুদে বার্তায় বলছেন, ‘ইব্রাহিম ভাই, ৫ তারিখের কাজ ১০০% কনফার্ম। একবিন্দু এদিক-সেদিক হবে না। আল্লাহর ওপর ভরসা রেখে আপনাকে কথা দিলাম, সব কটি কাজ আপনাকে ১০০/১০০ তুলে দেব। আগামী ২১ তারিখের মধ্যে সব টাকা ক্লিয়ার করতে হবে। প্রতিটি আবেদন রেডি করে জমা দেওয়ার এক দিন পূর্বে পিডিএফ করে পাঠাবেন। আমরা চেক করে ক্লিয়ারেন্স দিলে জমা দেবেন।’
আরেক বার্তায় এক প্রার্থীকে বলা হচ্ছে, ‘কাজটা হওয়া খুব জরুরি ভাই। ৩ তারিখে এই ছেলের ভাইভা পার করতে হবে।’ অপর পাশ থেকে নির্দেশ আসে, ‘আগামীকাল একটু সময় করে ভূমি রেকর্ড প্রার্থীর টাকা দিয়ে দিয়েন। আর উপসহকারী প্রকৌশলীর ভাইভার টাকাটা দিয়ে যাবেন।’ রিটেন পাসের জন্য দাবি করা হয়, ‘ভাই, রিটেন পাস করতে চাইলে ৭ লাখ লাগবে।’
রেলওয়ের পরীক্ষার প্রশ্ন নিয়ে আরেক বার্তায় বলা হচ্ছে, ‘টাকা চাই আগে এক লাখ। এখন দিতে হবে। রেজাল্ট দুই-তিন দিনের মধ্যে দিয়ে দেবে।’ অন্য প্রান্তে থাকা ব্যক্তি বলছেন, ‘আমি ক্লিয়ারেন্স না দেওয়া পর্যন্ত কিছু কইরেন না…অন্য গ্রুপের কী খবর? ১২ জনের গ্রুপের কি খবর আছে?’
সিআইডির উদ্ধার করা হোয়াটসঅ্যাপের এমন অনেক বার্তায় বিসিএস, পিএসসির নন-ক্যাডারসহ সরকারি নিয়োগ পরীক্ষাগুলোতে প্রশ্নপত্র ফাঁস ও চাকরি বিক্রির নেটওয়ার্কের তথ্য পাওয়া যায়। গাড়িচালক সৈয়দ আবেদ আলীকে সামনে দেখা গেলেও এই বাণিজ্যের মূল কারিগর ছিল পিএসসির ভেতরের কিছু কর্মকর্তা-কর্মচারী ও বিজি প্রেসের চক্র।
আদালত সূত্রে জানা যায়, দীর্ঘ তদন্ত শেষে গত ১৮ মে আদালতে ৫৫ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র (চার্জশিট) জমা দিয়েছেন মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ও সিআইডির অতিরিক্ত পুলিশ সুপার সুমন কুমার সাহা। যার মধ্যে ৩৭ জনের বিরুদ্ধে মানি লন্ডারিংয়ের আলাদা অনুসন্ধান চলছে। ৫৫ আসামির মধ্যে ২৬ জন গ্রেপ্তার হয়েছিলেন, তাঁদের মধ্যে একজন কারাগারে এবং আবেদ আলী, সিয়ামসহ বাকি ২৫ জন জামিনে আছেন। ২৯ আসামি এখনো পলাতক। অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়ায় ৩১তম বিসিএস পুলিশ ক্যাডারের কর্মকর্তা মো. জাকারিয়া রহমানকে মামলা থেকে অব্যাহতির সুপারিশ করেছে সিআইডি। তবে মো. গোলাম হামিদুর রহমান, হামিদুল ইসলাম জিয়া, মো. মাহাবুব আলম ও আজাদ ঘটনার সঙ্গে জড়িত থাকলেও তাঁদের পূর্ণাঙ্গ নাম-ঠিকানা এখনো নিশ্চিত করতে পারেনি তদন্ত সংস্থা।
২০২৪ সালের ৯ জুলাই পল্টন থানায় মামলাটি করেছিলেন সিআইডির উপপরিদর্শক নিপ্পন চন্দ্র চন্দ। আদালত ১৫ সেপ্টেম্বর পলাতক আসামিদের নাম পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি দিয়ে আগামী ২৫ অক্টোবরের মধ্যে প্রকাশ করার জন্য নির্দেশ দিয়েছেন।























