Dhaka , শনিবার, ১৭ অক্টোবর ২০২৬, ২ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
শিরোনাম :
যুব ফুটবল টুর্নামেন্ট ২০২৬-এর প্রথম সেমিফাইনালে ধরেন্ডা যুব কল্যাণ সংঘের জয় ৭৮তম আন্তর্জাতিক ক্রেডিট ইউনিয়ন দিবস-২০২৬ উপলক্ষে কালবের উদ্যোগে বিশেষ আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত রোনালদোর পর্তুগাল দলে না ফেরার সম্ভাবনা দেখছেন তাঁর বোন অস্ত্রোপচারের পর সুস্থ হয়ে উঠছেন পোপ চতুর্দশ লিও টঙ্গীতে ওষুধ কারখানার আগুন চার ঘণ্টা পর নিয়ন্ত্রণে আগামী শিক্ষাবর্ষের পাঠ্যবইয়ে স্বাধীনতা ঘোষণার বর্ণনা বদলাবে, এবার যেভাবে থাকছে চলতি অর্থবছরে মূল্যস্ফীতি বেড়ে প্রায় ১১% হতে পারে, আইএমএফের পূর্বাভাস অর্থনীতিতে যৌথভাবে নোবেল পেলেন যুক্তরাষ্ট্রের রবার্ট ই হল ও মাইকেল উডফোর্ড উপাচার্যকে ভেতরে রেখে ভবনে তালা দিলেন চুয়েট শিক্ষার্থীরা, ‘নতুন ভিসি প্রত্যাখ্যান’ স্লোগান জ্ঞানেশের বিদায় ও মোদি সরকারের পতন অনিবার্য, এরপর শুরু হবে গণতন্ত্র মেরামতের কাজ: রাহুল গান্ধী

দত্তকের নামে শিশু কেনাবেচা, ফেসবুকে চলে দর–কষাকষি

রিপোর্ট: নীড় সংবাদ ডেস্ক

চড়া দাম হাঁকিয়ে শিশু বিক্রির প্রস্তাব এসেছে ফেসবুকের একটি পোস্টে, ‘ইমার্জেন্সি একটা ছেলে বাচ্চা দেওয়া হবে, বয়স ৬ মাস, ডিমান্ড ২ লাখ টাকা, লোকেশন চট্টগ্রাম।’

আমি পোস্টটি পড়লাম ‘সন্তান দত্তক দেওয়া-নেওয়া হয়’ নামের একটি গ্রুপে। পোস্টদাতা প্রতারকদের দূরে থাকতে বলেছেন। তিনি লিখেছেন, ৫০ হাজার বা ১ লাখ টাকা যাঁরা চাইছেন, তাঁরা আসলে বাচ্চা দেবেন না।

এই যুক্তি খাড়া করে গত ১৩ সেপ্টেম্বর তিনি সম্ভাব্য ক্রেতাদের উদ্দেশে লিখেছেন, ‘এটা ১০০% রিয়েল পোস্ট, সবকিছু বুঝেশুনে তারপর নক দিবেন।’

ফেসবুকে ‘বাচ্চা দত্তক নেওয়া এবং দেওয়ার গ্রুপ’-এর সদস্যসংখ্যা পাঁচ হাজারের বেশি। এখানে একজন নামবিহীন অংশগ্রহণকারী ফোন নম্বর দিয়ে গত বছর লিখেছিলেন, ‘একটি বাচ্চা মেয়ে বিক্রি করা হবে।’

গত জুনে ‘দত্তক দেওয়া ও নেওয়া/চাইল্ড অ্যাডপশন’ গ্রুপে একজন লিখেছেন, ‘বিশেষ অফারে একটা ছেলে বাবু দত্তক দেয়া হবে।’ ফেসবুকে কাছাকাছি নামের অনেক গ্রুপে এমন বিজ্ঞপ্তির ছড়াছড়ি। গ্রুপগুলোতে দত্তকের জন্য বাচ্চা চাওয়ার পোস্টও অনেক।

এভাবে ফেসবুকে রীতিমতো দর–কষাকষি করে অর্ডার দিয়ে কেনাবেচার আলাপ চলছে শিশু মায়ের গর্ভে থাকার সময় থেকে। ফেসবুকের বাইরে টাকার বিনিময়ে দত্তক দেওয়া–নেওয়ার একটি প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগ আমরা সরেজমিনে দেখে এসেছি।

এগুলো আইন এবং সরকারের নজরদারির বাইরে চলছে। এভাবে কত শিশু কেনাবেচা হচ্ছে, সে তথ্য পাওয়া কঠিন।

গত ১২ আগস্ট থেকে ১৬ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত প্রথম আলোর ফ্যাক্টচেকার মো. সোহাগ মিয়ার সঙ্গে মিলে যাচাই-বাছাই করে আমরা ফেসবুকের ৩৯টি পাবলিক গ্রুপ ঘেঁটে দেখেছি। বেশির ভাগের সদস্যসংখ্যা কয়েক শ, তবে প্রায় ২০ হাজার সদস্যের গ্রুপও আছে।

পরিস্থিতি অনুসন্ধানের জন্য তিনটি গ্রুপে যোগ দিয়েছি; পরিচয় দিয়ে অথবা গোপন করে ইনবক্সে আর মুঠোফোনে দর–কষাকষি করেছি। নিয়মিত ফলো করেছি দুটি গ্রুপ।

চোখে পড়েছে, মেয়েশিশুর চেয়ে ছেলেশিশুর দর বেশি। হাতে গোনা কিছু পোস্টে শিশু প্রাপ্তির কথা আছে। প্রতারণার ঝুঁকি আর অভিজ্ঞতার কথা আছে বেশ কিছু পোস্টে। কোনো পোস্টদাতাকে বাটপারও বলা হয়েছে। কিছু পোস্টদাতা একাধিক গ্রুপে সক্রিয়।

কিছু পোস্টে গর্ভকালীন বিভিন্ন পর্যায়ের ডাক্তারি রিপোর্ট কিনতে চাওয়া হয়েছে। বেশ কিছু গ্রুপে শুক্রাণু (স্পার্ম) দান অথবা গর্ভদানের (সারোগেসি) আলাপই প্রধান। সেগুলোতে যৌনসেবা সরবরাহের প্রস্তাবও আছে।

একটি গ্রুপের মাধ্যমে আমরা এক নারী দালালের খোঁজ পাই। নাম প্রকাশ না করার শর্তে মুঠোফোনে তিনি বলেছেন, বিভিন্ন হাসপাতাল থেকে তাঁরা সন্তান রাখতে অনিচ্ছুক গর্ভবতীদের সন্ধান পান। গর্ভবতী নারীরা বাচ্চা দিয়ে দিতে রাজি হলে সংঘবদ্ধ চক্র প্রসব পর্যন্ত তাঁদের দেখভাল করে। ছেলে নবজাতকের দাম পড়ে তিন লাখ আর মেয়ের দুই লাখ টাকা। দালালেরা কমিশন পান।

এদিকে কুষ্টিয়ার আবদুল আলিম একটি গ্রুপে লিখেছেন, তিনি তিনবার ঠকেছেন। মুঠোফোনে প্রথম আলোকে তিনি বলেন, শেষ দফায় একটি নবজাতকের জন্য দাম ঠিক করেছিলেন। এক নারী হোয়াটসঅ্যাপে ভিডিও কলে বাচ্চাকে দেখান। তারপর পথখরচা বাবদ অগ্রিম ১০ হাজার টাকা চান।

আবদুল আলিম বলেন, বিশ্বাস করে বিকাশে টাকা পাঠানোর পর ফেসবুকের সেই গ্রুপ উধাও। হোয়াটসঅ্যাপসহ সব নম্বর ব্লক করে দেয়। তাঁর আক্ষেপ, প্রতারক চক্রকে থামানো বা দেখার কেউ নেই!

আমরা এক ডজন গ্রুপের ২৮৮টি পোস্ট খুঁটিয়ে পর্যালোচনা করেছি। এগুলোর মধ্যে দত্তকের জন্য শিশু প্রার্থনা করে পোস্ট ছিল ৩৪টি। আর শিশু দেওয়ার প্রস্তাব ছিল ৬৩টি পোস্টে। ছেলে-মেয়ে উল্লেখ করার পাশাপাশি ‘বেবি’,‘নিউবর্ন’, ‘সন্তান’, ‘যমজ বাচ্চা’ এমন চাহিদা আর জোগানের কথা আছে।

হাটে হাঁকডাকের কিছু নমুনা দেখুন—‘আমার একটা ছেলে বাবু চাই, খুব ইমার্জেন্সি দরকার।’ ‘অক্টোবর অথবা নভেম্বর মাসে বাচ্চা লাগবে।’ একজন ৫০ হাজার টাকা বাজেটে ১০ দিন বা ১ মাসের ছেলে বাচ্চা চেয়েছেন।

এক নারী লিখেছেন, পাঁচ-ছয় মাসের গর্ভবতীর সঙ্গে চুক্তি করবেন। সিজারিয়ানের খরচ দিয়ে শিশুকে ইতালি নিয়ে যাবেন। আরেকজন অস্ট্রেলিয়ায় নেওয়ার জন্য তিন-চার মাস বয়সী ‘সুন্দর, ফরসা, কিউট মেয়ে বাবু’ চেয়েছেন।

এক শিশু বিক্রেতা লিখেছেন, ‘একটা মেয়ে বাচ্চা দত্তক দেওয়া হবে, পরিবারের “ডিমান্ড” আছে, কোনো অগ্রিম দিতে হবে না, আসবেন, দেখবেন, কথা বলবেন, কাগজ করবেন, নিয়ে চলে যাবেন।’

বাচ্চা নিতে চাইলে ইনবক্সে লিখতে বলা হয়, তখন যোগাযোগের ফোন নম্বরও পাওয়া যায়। শিশু দিতে আগ্রহী আটজনের সঙ্গে আমরা সাংবাদিক পরিচয় দিয়ে অথবা গোপন রেখে মুঠোফোনে, হোয়াটসঅ্যাপে ও মেসেঞ্জারে কথা বলেছি।

দুই লাখ টাকায় ‘ইমার্জেন্সি ছেলে বাচ্চা’ বিষয়ে পোস্টটি যিনি দিয়েছিলেন, তিনি একাধিক গ্রুপে সক্রিয়। সাংবাদিক পরিচয় দিয়ে প্রথমে মেসেঞ্জারে, পরে মুঠোফোন নম্বরে তাঁর সঙ্গে কথা বলি।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে তিনি বলেন, বাচ্চার মায়ের অনুরোধেই তিনি ফেসবুকে পোস্টটি দিয়েছেন। এই বাচ্চা বিক্রির সঙ্গে তিনি জড়িত নন। পোস্টে কোথাও মায়ের ফোন নম্বর ছিল না। তিনি একটা নম্বর দিলেন।

পোস্টে ছিল ‘লোকেশন চট্টগ্রাম’। ১৩ সেপ্টেম্বর ফোন করলে এক নারী বললেন, তিনি নরসিংদী থাকেন। শিশুটি নেব বললে তিনি আমার কাছে এক লাখ টাকা চাইলেন। বললেন, ‘বাচ্চা হইতে, বাচ্চারে ৬ মাস পালতে, প্যাম্পার্স কিনতেই তো ৫০ হাজার টাকা খরচ হইয়া গেছে।’

কিন্তু বাচ্চাটা বিক্রি করবেন কেন? তাঁর উত্তর, ‘স্বামী চইল্যা গেছে। আরেক বাচ্চা আছে। ফ্যামেলিগত সমস্যা আছে।’

তিনি নিজের নাম-ঠিকানা দিলেন না, আমার নাম-পরিচয়ও জানতে চাইলেন না। বললেন, নরসিংদী গিয়ে ফোন করলে ঠিকানা দেবেন অথবা আমার ঠিকানা দিলে বাচ্চাকে সেখানে পৌঁছে দেবেন।

বাচ্চাকে দেখতে চাইলে এই নারী হোয়াটসঅ্যাপে একটি শিশুর ছবি এবং টিকার কার্ড পাঠালেন। সেই কার্ডে বাবার নাম লেখা রাকিব হাসান। ঠিকানা গাজীপুরের কাপাসিয়ায়। নারীটির হোয়াটসঅ্যাপ অ্যাকাউন্টও রাকিব হাসানের নামে।

ফেসবুক গ্রুপের সেই পোস্টদাতাকে ফোন দিলে এবার তিনি বললেন, ফেনী থেকে একজন ১ লাখ ৭০ হাজার টাকা দিতে চাচ্ছেন। কিন্তু দুই লাখ টাকাই লাগবে। পরে আবার বললেন, তাঁর উদ্দেশ্য ওই মাকে সাহায্য করা। এখান থেকে তিনি কোনো টাকার ভাগ পাবেন না।

একটি গ্রুপে ‘কাদের কাদের’ নামের একজন নিজের সঙ্গে দেড়-দুই বছর বয়সী একটি শিশুর ছবি পোস্ট করে লিখেছেন, এটা তাঁর নিজের সন্তান। স্ত্রী তাঁকে ছেড়ে দেবেন। স্ত্রীর মোহরানা পরিশোধ করতে তিনি ছেলেকে ৩ লাখ ৫০ হাজার টাকার বিনিময়ে দত্তক দেবেন।

আরেকটি পোস্টে ব্যক্তিটি তাঁর ফোন নম্বর দিয়েছেন। সাংবাদিক পরিচয় গোপন রেখে তাঁর সঙ্গে কথা বলি। তিনি বললেন, নিজের বাচ্চা নিজে দত্তক দিলে সমস্যার কিছু নেই।

অবসরপ্রাপ্ত সিনিয়র জেলা ও দায়রা জজ ফউজুল আজিম আইন কমিশনের মুখ্য গবেষণা কর্মকর্তা ছিলেন। তিনি বলছেন, ‘শিশু দত্তক’, ‘নবজাতক প্রয়োজন’, ‘শিশু নিতে চাই’, ‘বিনিময়ে এত টাকা’—এ ধরনের পোস্টকে সম্ভাব্য শিশু পাচার বা শোষণের ঝুঁকি হিসেবে দেখা দরকার। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থার উচিত বিষয়টি প্রাথমিকভাবে যাচাই করা।

বেআইনি ও অনৈতিক কাজে ব্যবহারের উদ্দেশ্যে কোনো শিশুকে বেচা, কেনা বা হস্তান্তর করলে ১৮৬০ সালের দণ্ডবিধির ৩৭২ ও ৩৭৩ ধারায় কঠোর শাস্তির বিধান আছে। ২০২৬ সালের মানব পাচার ও অভিবাসী চোরাচালান প্রতিরোধ ও দমন আইনে ‘অসৎ উদ্দেশ্যে’ দত্তক গ্রহণকে শোষণ হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।

ফউজুল আজিম প্রথম আলোকে বলেন, ‘এ ধরনের বাণিজ্যিক বিজ্ঞাপন বা দরদাম যদি বাস্তবে শিশুর হস্তান্তরের সঙ্গে যুক্ত থাকে, তাহলে টাকা কারা নিচ্ছে, কোনো মধ্যস্থতাকারী বা চক্র আছে কি না এবং শিশুকে ভবিষ্যতে কী উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা হবে, তদন্তে তা দেখতে হবে।’

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের অধ্যাপক শাহনাজ হুদার মতে, সবচেয়ে বড় বিপদ হচ্ছে, এভাবে কেনাবেচার পর শিশুরা কোথায় যাচ্ছে বা তাদের কী কাজে জড়ানো হচ্ছে, তার কোনো নজরদারি থাকছে না। তিনি বলেন, ‘অনেকে হয়তো এ ধরনের ব্যবসা করার জন্যই সন্তানের জন্ম দিচ্ছেন। বিষয়টিতে সরকারের নজরদারি জরুরি হয়ে পড়েছে।’

Tag :

Please Share This Post in Your Social Media

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information
Update Time : ১২:২৯ অপরাহ্ন, শনিবার, ৩ অক্টোবর ২০২৬

দত্তকের নামে শিশু কেনাবেচা, ফেসবুকে চলে দর–কষাকষি

Update Time : ১২:২৯ অপরাহ্ন, শনিবার, ৩ অক্টোবর ২০২৬

চড়া দাম হাঁকিয়ে শিশু বিক্রির প্রস্তাব এসেছে ফেসবুকের একটি পোস্টে, ‘ইমার্জেন্সি একটা ছেলে বাচ্চা দেওয়া হবে, বয়স ৬ মাস, ডিমান্ড ২ লাখ টাকা, লোকেশন চট্টগ্রাম।’

আমি পোস্টটি পড়লাম ‘সন্তান দত্তক দেওয়া-নেওয়া হয়’ নামের একটি গ্রুপে। পোস্টদাতা প্রতারকদের দূরে থাকতে বলেছেন। তিনি লিখেছেন, ৫০ হাজার বা ১ লাখ টাকা যাঁরা চাইছেন, তাঁরা আসলে বাচ্চা দেবেন না।

এই যুক্তি খাড়া করে গত ১৩ সেপ্টেম্বর তিনি সম্ভাব্য ক্রেতাদের উদ্দেশে লিখেছেন, ‘এটা ১০০% রিয়েল পোস্ট, সবকিছু বুঝেশুনে তারপর নক দিবেন।’

ফেসবুকে ‘বাচ্চা দত্তক নেওয়া এবং দেওয়ার গ্রুপ’-এর সদস্যসংখ্যা পাঁচ হাজারের বেশি। এখানে একজন নামবিহীন অংশগ্রহণকারী ফোন নম্বর দিয়ে গত বছর লিখেছিলেন, ‘একটি বাচ্চা মেয়ে বিক্রি করা হবে।’

গত জুনে ‘দত্তক দেওয়া ও নেওয়া/চাইল্ড অ্যাডপশন’ গ্রুপে একজন লিখেছেন, ‘বিশেষ অফারে একটা ছেলে বাবু দত্তক দেয়া হবে।’ ফেসবুকে কাছাকাছি নামের অনেক গ্রুপে এমন বিজ্ঞপ্তির ছড়াছড়ি। গ্রুপগুলোতে দত্তকের জন্য বাচ্চা চাওয়ার পোস্টও অনেক।

এভাবে ফেসবুকে রীতিমতো দর–কষাকষি করে অর্ডার দিয়ে কেনাবেচার আলাপ চলছে শিশু মায়ের গর্ভে থাকার সময় থেকে। ফেসবুকের বাইরে টাকার বিনিময়ে দত্তক দেওয়া–নেওয়ার একটি প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগ আমরা সরেজমিনে দেখে এসেছি।

এগুলো আইন এবং সরকারের নজরদারির বাইরে চলছে। এভাবে কত শিশু কেনাবেচা হচ্ছে, সে তথ্য পাওয়া কঠিন।

গত ১২ আগস্ট থেকে ১৬ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত প্রথম আলোর ফ্যাক্টচেকার মো. সোহাগ মিয়ার সঙ্গে মিলে যাচাই-বাছাই করে আমরা ফেসবুকের ৩৯টি পাবলিক গ্রুপ ঘেঁটে দেখেছি। বেশির ভাগের সদস্যসংখ্যা কয়েক শ, তবে প্রায় ২০ হাজার সদস্যের গ্রুপও আছে।

পরিস্থিতি অনুসন্ধানের জন্য তিনটি গ্রুপে যোগ দিয়েছি; পরিচয় দিয়ে অথবা গোপন করে ইনবক্সে আর মুঠোফোনে দর–কষাকষি করেছি। নিয়মিত ফলো করেছি দুটি গ্রুপ।

চোখে পড়েছে, মেয়েশিশুর চেয়ে ছেলেশিশুর দর বেশি। হাতে গোনা কিছু পোস্টে শিশু প্রাপ্তির কথা আছে। প্রতারণার ঝুঁকি আর অভিজ্ঞতার কথা আছে বেশ কিছু পোস্টে। কোনো পোস্টদাতাকে বাটপারও বলা হয়েছে। কিছু পোস্টদাতা একাধিক গ্রুপে সক্রিয়।

কিছু পোস্টে গর্ভকালীন বিভিন্ন পর্যায়ের ডাক্তারি রিপোর্ট কিনতে চাওয়া হয়েছে। বেশ কিছু গ্রুপে শুক্রাণু (স্পার্ম) দান অথবা গর্ভদানের (সারোগেসি) আলাপই প্রধান। সেগুলোতে যৌনসেবা সরবরাহের প্রস্তাবও আছে।

একটি গ্রুপের মাধ্যমে আমরা এক নারী দালালের খোঁজ পাই। নাম প্রকাশ না করার শর্তে মুঠোফোনে তিনি বলেছেন, বিভিন্ন হাসপাতাল থেকে তাঁরা সন্তান রাখতে অনিচ্ছুক গর্ভবতীদের সন্ধান পান। গর্ভবতী নারীরা বাচ্চা দিয়ে দিতে রাজি হলে সংঘবদ্ধ চক্র প্রসব পর্যন্ত তাঁদের দেখভাল করে। ছেলে নবজাতকের দাম পড়ে তিন লাখ আর মেয়ের দুই লাখ টাকা। দালালেরা কমিশন পান।

এদিকে কুষ্টিয়ার আবদুল আলিম একটি গ্রুপে লিখেছেন, তিনি তিনবার ঠকেছেন। মুঠোফোনে প্রথম আলোকে তিনি বলেন, শেষ দফায় একটি নবজাতকের জন্য দাম ঠিক করেছিলেন। এক নারী হোয়াটসঅ্যাপে ভিডিও কলে বাচ্চাকে দেখান। তারপর পথখরচা বাবদ অগ্রিম ১০ হাজার টাকা চান।

আবদুল আলিম বলেন, বিশ্বাস করে বিকাশে টাকা পাঠানোর পর ফেসবুকের সেই গ্রুপ উধাও। হোয়াটসঅ্যাপসহ সব নম্বর ব্লক করে দেয়। তাঁর আক্ষেপ, প্রতারক চক্রকে থামানো বা দেখার কেউ নেই!

আমরা এক ডজন গ্রুপের ২৮৮টি পোস্ট খুঁটিয়ে পর্যালোচনা করেছি। এগুলোর মধ্যে দত্তকের জন্য শিশু প্রার্থনা করে পোস্ট ছিল ৩৪টি। আর শিশু দেওয়ার প্রস্তাব ছিল ৬৩টি পোস্টে। ছেলে-মেয়ে উল্লেখ করার পাশাপাশি ‘বেবি’,‘নিউবর্ন’, ‘সন্তান’, ‘যমজ বাচ্চা’ এমন চাহিদা আর জোগানের কথা আছে।

হাটে হাঁকডাকের কিছু নমুনা দেখুন—‘আমার একটা ছেলে বাবু চাই, খুব ইমার্জেন্সি দরকার।’ ‘অক্টোবর অথবা নভেম্বর মাসে বাচ্চা লাগবে।’ একজন ৫০ হাজার টাকা বাজেটে ১০ দিন বা ১ মাসের ছেলে বাচ্চা চেয়েছেন।

এক নারী লিখেছেন, পাঁচ-ছয় মাসের গর্ভবতীর সঙ্গে চুক্তি করবেন। সিজারিয়ানের খরচ দিয়ে শিশুকে ইতালি নিয়ে যাবেন। আরেকজন অস্ট্রেলিয়ায় নেওয়ার জন্য তিন-চার মাস বয়সী ‘সুন্দর, ফরসা, কিউট মেয়ে বাবু’ চেয়েছেন।

এক শিশু বিক্রেতা লিখেছেন, ‘একটা মেয়ে বাচ্চা দত্তক দেওয়া হবে, পরিবারের “ডিমান্ড” আছে, কোনো অগ্রিম দিতে হবে না, আসবেন, দেখবেন, কথা বলবেন, কাগজ করবেন, নিয়ে চলে যাবেন।’

বাচ্চা নিতে চাইলে ইনবক্সে লিখতে বলা হয়, তখন যোগাযোগের ফোন নম্বরও পাওয়া যায়। শিশু দিতে আগ্রহী আটজনের সঙ্গে আমরা সাংবাদিক পরিচয় দিয়ে অথবা গোপন রেখে মুঠোফোনে, হোয়াটসঅ্যাপে ও মেসেঞ্জারে কথা বলেছি।

দুই লাখ টাকায় ‘ইমার্জেন্সি ছেলে বাচ্চা’ বিষয়ে পোস্টটি যিনি দিয়েছিলেন, তিনি একাধিক গ্রুপে সক্রিয়। সাংবাদিক পরিচয় দিয়ে প্রথমে মেসেঞ্জারে, পরে মুঠোফোন নম্বরে তাঁর সঙ্গে কথা বলি।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে তিনি বলেন, বাচ্চার মায়ের অনুরোধেই তিনি ফেসবুকে পোস্টটি দিয়েছেন। এই বাচ্চা বিক্রির সঙ্গে তিনি জড়িত নন। পোস্টে কোথাও মায়ের ফোন নম্বর ছিল না। তিনি একটা নম্বর দিলেন।

পোস্টে ছিল ‘লোকেশন চট্টগ্রাম’। ১৩ সেপ্টেম্বর ফোন করলে এক নারী বললেন, তিনি নরসিংদী থাকেন। শিশুটি নেব বললে তিনি আমার কাছে এক লাখ টাকা চাইলেন। বললেন, ‘বাচ্চা হইতে, বাচ্চারে ৬ মাস পালতে, প্যাম্পার্স কিনতেই তো ৫০ হাজার টাকা খরচ হইয়া গেছে।’

কিন্তু বাচ্চাটা বিক্রি করবেন কেন? তাঁর উত্তর, ‘স্বামী চইল্যা গেছে। আরেক বাচ্চা আছে। ফ্যামেলিগত সমস্যা আছে।’

তিনি নিজের নাম-ঠিকানা দিলেন না, আমার নাম-পরিচয়ও জানতে চাইলেন না। বললেন, নরসিংদী গিয়ে ফোন করলে ঠিকানা দেবেন অথবা আমার ঠিকানা দিলে বাচ্চাকে সেখানে পৌঁছে দেবেন।

বাচ্চাকে দেখতে চাইলে এই নারী হোয়াটসঅ্যাপে একটি শিশুর ছবি এবং টিকার কার্ড পাঠালেন। সেই কার্ডে বাবার নাম লেখা রাকিব হাসান। ঠিকানা গাজীপুরের কাপাসিয়ায়। নারীটির হোয়াটসঅ্যাপ অ্যাকাউন্টও রাকিব হাসানের নামে।

ফেসবুক গ্রুপের সেই পোস্টদাতাকে ফোন দিলে এবার তিনি বললেন, ফেনী থেকে একজন ১ লাখ ৭০ হাজার টাকা দিতে চাচ্ছেন। কিন্তু দুই লাখ টাকাই লাগবে। পরে আবার বললেন, তাঁর উদ্দেশ্য ওই মাকে সাহায্য করা। এখান থেকে তিনি কোনো টাকার ভাগ পাবেন না।

একটি গ্রুপে ‘কাদের কাদের’ নামের একজন নিজের সঙ্গে দেড়-দুই বছর বয়সী একটি শিশুর ছবি পোস্ট করে লিখেছেন, এটা তাঁর নিজের সন্তান। স্ত্রী তাঁকে ছেড়ে দেবেন। স্ত্রীর মোহরানা পরিশোধ করতে তিনি ছেলেকে ৩ লাখ ৫০ হাজার টাকার বিনিময়ে দত্তক দেবেন।

আরেকটি পোস্টে ব্যক্তিটি তাঁর ফোন নম্বর দিয়েছেন। সাংবাদিক পরিচয় গোপন রেখে তাঁর সঙ্গে কথা বলি। তিনি বললেন, নিজের বাচ্চা নিজে দত্তক দিলে সমস্যার কিছু নেই।

অবসরপ্রাপ্ত সিনিয়র জেলা ও দায়রা জজ ফউজুল আজিম আইন কমিশনের মুখ্য গবেষণা কর্মকর্তা ছিলেন। তিনি বলছেন, ‘শিশু দত্তক’, ‘নবজাতক প্রয়োজন’, ‘শিশু নিতে চাই’, ‘বিনিময়ে এত টাকা’—এ ধরনের পোস্টকে সম্ভাব্য শিশু পাচার বা শোষণের ঝুঁকি হিসেবে দেখা দরকার। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থার উচিত বিষয়টি প্রাথমিকভাবে যাচাই করা।

বেআইনি ও অনৈতিক কাজে ব্যবহারের উদ্দেশ্যে কোনো শিশুকে বেচা, কেনা বা হস্তান্তর করলে ১৮৬০ সালের দণ্ডবিধির ৩৭২ ও ৩৭৩ ধারায় কঠোর শাস্তির বিধান আছে। ২০২৬ সালের মানব পাচার ও অভিবাসী চোরাচালান প্রতিরোধ ও দমন আইনে ‘অসৎ উদ্দেশ্যে’ দত্তক গ্রহণকে শোষণ হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।

ফউজুল আজিম প্রথম আলোকে বলেন, ‘এ ধরনের বাণিজ্যিক বিজ্ঞাপন বা দরদাম যদি বাস্তবে শিশুর হস্তান্তরের সঙ্গে যুক্ত থাকে, তাহলে টাকা কারা নিচ্ছে, কোনো মধ্যস্থতাকারী বা চক্র আছে কি না এবং শিশুকে ভবিষ্যতে কী উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা হবে, তদন্তে তা দেখতে হবে।’

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের অধ্যাপক শাহনাজ হুদার মতে, সবচেয়ে বড় বিপদ হচ্ছে, এভাবে কেনাবেচার পর শিশুরা কোথায় যাচ্ছে বা তাদের কী কাজে জড়ানো হচ্ছে, তার কোনো নজরদারি থাকছে না। তিনি বলেন, ‘অনেকে হয়তো এ ধরনের ব্যবসা করার জন্যই সন্তানের জন্ম দিচ্ছেন। বিষয়টিতে সরকারের নজরদারি জরুরি হয়ে পড়েছে।’