বৃহত্তর কুষ্টিয়া অঞ্চলের খ্রিষ্টীয় ঐতিহ্য:
‘প্রভু যীশুর নাম জপ’ বা নাম কীর্তন গান
লেখক: নিউটন মণ্ডল
“প্রভু যীশু, প্রভু যীশু, প্রভু যীশুর নাম জপ…”
করতালের ঝংকার, খোলের তাল, ধূপের সুগন্ধ আর শত শত খ্রিষ্টভক্তের সমবেত কণ্ঠে উচ্চারিত এই নামধ্বনি শুধু একটি গান নয়; এটি বৃহত্তর কুষ্টিয়া অঞ্চলের খ্রিষ্টান সমাজের এক জীবন্ত আধ্যাত্মিক ঐতিহ্য। যুগের পর যুগ ধরে এই অঞ্চলের খ্রিষ্টভক্তরা ‘প্রভু যীশুর নাম জপ’ বা ‘নাম কীর্তন’-এর মাধ্যমে নিজেদের বিশ্বাস, ভক্তি, প্রার্থনা ও সাংস্কৃতিক পরিচয়কে লালন করে আসছেন।
রাতের নীরবতা ভেঙে যখন ভেসে আসে “প্রভু যীশু, প্রভু যীশু, প্রভু যীশুর নাম জপ…” তখন মনে হয় যেন সমগ্র জনপদ একসঙ্গে প্রার্থনায় নিমগ্ন হয়েছে। নাম জপের আসরে অংশগ্রহণকারী অনেক ভক্তকে চোখের জল ফেলতে দেখা যায়। আবার কেউ গভীর প্রশান্তিতে ডুবে যান। তাদের বিশ্বাস, যীশুর পবিত্র নামের মধ্যেই রয়েছে আত্মার শান্তি, আশ্রয় এবং ঈশ্বরের সান্নিধ্য লাভের পথ।

যেভাবে শুরু হয়েছিল ‘প্রভু যীশুর নাম জপ’
স্থানীয় ঐতিহ্য ও প্রবীণদের বর্ণনা অনুযায়ী, মেহেরপুর জেলার বল্লভপুর গ্রামের একজন নিবেদিতপ্রাণ খ্রিষ্টভক্ত ভোলা দামপচা এই নাম জপ কীর্তনের প্রবর্তক হিসেবে পরিচিত। জানা যায়, একসময় বল্লভপুর গ্রামের আটজন খ্রিষ্টভক্ত ভারতের পশ্চিমবঙ্গের নদীয়া জেলার একটি হিন্দু কীর্তন দলের সঙ্গে বাদ্যযন্ত্র বাজানোর উদ্দেশ্যে ‘নাম কীর্তন’-এ অংশগ্রহণ করেন। সেখানে সমবেতভাবে কৃষ্ণের ও হরির নামবন্দনা ও ভক্তিমূলক পরিবেশনা তাদের গভীরভাবে অনুপ্রাণিত করে। দেশে ফিরে তারা ভাবতে শুরু করেন, খ্রিষ্টান সমাজের মধ্যেও কি এমন একটি ভক্তিমূলক আয়োজন গড়ে তোলা যায়, যেখানে যীশু খ্রিষ্টের নাম ও মহিমা প্রচার করা হবে? সেই চিন্তা থেকেই ভোলা দামপচা রচনা করেন বিখ্যাত চরণ-

“প্রভু যীশু, প্রভু যীশু, প্রভু যীশুর নাম জপ।”
এরপর বল্লভপুর গ্রামের মাঠপাড়ার বটতলায় প্রথমবারের মতো এই নাম জপ কীর্তনের আয়োজন করা হয়। খ্রিষ্টের নাম প্রচারের এই উদ্যোগকে সফল করতে গ্রামের এক খ্রিষ্টভক্ত দুই মণ চাল দান করেন। পরে গ্রামের অন্যান্য মানুষের সহযোগিতায় তিন দিনব্যাপী অনুষ্ঠানের আয়োজন সম্পন্ন হয়। সেখান থেকেই শুরু হয় বৃহত্তর কুষ্টিয়া অঞ্চলের এক নতুন আধ্যাত্মিক ঐতিহ্যের যাত্রা।

কৃষিজীবী সমাজ ও নাম জপের সম্পর্ক
বৃহত্তর কুষ্টিয়া অঞ্চলের অধিকাংশ মানুষ ঐতিহ্যগতভাবে কৃষিকাজের সঙ্গে সম্পৃক্ত। তাই কৃষিকাজের ব্যস্ততা কমে গেলে, বিশেষ করে ফসল ঘরে তোলার পর কিংবা অবসর সময়ে বিভিন্ন গ্রামে নাম জপ কীর্তনের আয়োজন করা হতো। এই আয়োজন শুধু ধর্মীয় অনুষ্ঠান নয়; এটি ছিল গ্রামীণ খ্রিষ্টান সমাজের সামাজিক সম্প্রীতি, পারস্পরিক সহযোগিতা এবং বিশ্বাসের মিলনমেলা। এখনও কোনো গ্রাম ‘প্রভু যীশুর নাম জপ’-এর আয়োজন করলে প্রায় দুই সপ্তাহ আগে থেকেই শুরু হয় ব্যাপক প্রস্তুতি। গ্রামের মানুষ স্বেচ্ছায় চাল, ডাল, সবজি ও অন্যান্য খাদ্যসামগ্রী দান করেন। অনেকে অর্থ সহায়তা দেন। ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে বসবাসরত গ্রামের সন্তানরাও এই আয়োজনে আর্থিক সহযোগিতা করে থাকেন। ফলে পুরো অনুষ্ঠানটি হয়ে ওঠে এক সম্মিলিত বিশ্বাসের প্রকাশ।

আমন্ত্রণ, আগমন ও উদ্বোধনের ঐতিহ্য
অনুষ্ঠানের প্রায় দুই সপ্তাহ আগে বিভিন্ন গ্রামের কীর্তন দলের কাছে আমন্ত্রণপত্র পাঠানো হয়। আমন্ত্রণ পেয়ে নির্ধারিত দিনে দূর-দূরান্ত থেকে কীর্তন দলগুলো উপস্থিত হয়। অতিথি দলগুলো গ্রামে প্রবেশ করলে স্বাগতিক দল কীর্তন গেয়ে তাদের বরণ করে নেয়। বাদ্যযন্ত্রের তালে তালে গানের সুরে মুখরিত হয়ে ওঠে পুরো গ্রাম। বর্তমানে উদ্বোধনী অনুষ্ঠান আরও সুসংগঠিত ও বর্ণাঢ্য রূপ লাভ করেছে। স্থানীয় পাল-পুরোহিত, সিস্টারগণ, ক্যাটিখ্রিষ্ট, যুবসমাজ এবং অসংখ্য খ্রিষ্টভক্তের উপস্থিতিতে প্রার্থনা ও আশীর্বাদের মাধ্যমে অনুষ্ঠানের সূচনা করা হয়। এরপর বিভিন্ন কীর্তন দল পর্যায়ক্রমে ভক্তিমূলক গান পরিবেশন করতে থাকে।

২৪ ঘণ্টার নিরবচ্ছিন্ন যীশু বন্দনা
নাম জপ কীর্তনের মূল আকর্ষণ হলো ২৪ ঘণ্টাব্যাপী নিরবচ্ছিন্ন যীশু বন্দনা। পরদিন ভোর থেকে শুরু হয় এই বিশেষ পর্ব। যীশু খ্রিষ্টের প্রতিকৃতি, ছবি, ফুল, আলোকসজ্জা ও ধর্মীয় প্রতীক দিয়ে সাজানো হয় বিশেষ বেদী। ধূপের সুগন্ধে ভরে ওঠে চারপাশ। প্রতিটি কীর্তন দল সাধারণত এক ঘণ্টা সময় পায়। নতুন দল মঞ্চে প্রবেশের সময় ধূপারতি বা আরতির মাধ্যমে তাদের বরণ করে নেওয়া হয়। এরপর তারা নিজস্ব সুর ও ছন্দে যীশুর নাম জপ করতে থাকে। একটি দলের পর আরেকটি দল-এভাবেই বিরতিহীনভাবে চলতে থাকে নামজপ গান। রাত পেরিয়ে ভোর, ভোর পেরিয়ে দিন যীশুর নাম ধ্বনিত হতে থাকে অবিরাম। অনেক সময় কীর্তন গাইতে গাইতে শিল্পীরা আবেগে আপ্লুত হয়ে পড়েন। কারও চোখে অশ্রু ঝরে, কেউ হাত তুলে প্রার্থনা করেন, আবার কেউ গভীর ধ্যানে নিমগ্ন হন। এই দৃশ্য নাম জপকে শুধু একটি সংগীতানুষ্ঠান নয়, বরং এক গভীর আধ্যাত্মিক অভিজ্ঞতায় পরিণত করে।
কেন আয়োজন করা হতো নাম জপ?
বর্তমান যুগে নাম জপ মূলত ভক্তি, প্রার্থনা ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের অংশ হলেও অতীতে এর পেছনে ছিল মানুষের জীবনসংগ্রামের বাস্তব অভিজ্ঞতা। একসময় বিজ্ঞান, চিকিৎসাব্যবস্থা ও যোগাযোগ প্রযুক্তি আজকের মতো উন্নত ছিল না। তখন রোগব্যাধি, মহামারি, খরা, প্রাকৃতিক দুর্যোগ কিংবা পারিবারিক সংকটের সময়ে মানুষ ঈশ্বরের করুণা লাভের উদ্দেশ্যে সমবেত প্রার্থনা ও কীর্তনের আয়োজন করত। পাপমোচন, রোগমুক্তি, বৃষ্টির জন্য প্রার্থনা, কৃষিকাজের সফলতা কিংবা ঈশ্বরকে ধন্যবাদ জানানোর উদ্দেশ্যে এসব নাম জপের আয়োজন করা হতো। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই ঐতিহ্য নতুন নতুন মাত্রা লাভ করেছে। বর্তমানে মৃত্যুর দিন, মৃতদেহ গির্জা ও কবরস্থানে নিয়ে যাওয়ার সময়, মৃত্যুর তৃতীয় দিন, চল্লিশা এবং বিভিন্ন ধর্মীয় অনুষ্ঠান উপলক্ষেও কীর্তন গানের ব্যাপক প্রচলন রয়েছে।
গ্রামবাংলার খ্রিষ্টীয় সংস্কৃতির প্রাণস্পন্দন
আজ বৃহত্তর কুষ্টিয়া অঞ্চলের প্রায় প্রতিটি খ্রিষ্টান গ্রামেই অন্তত একটি কীর্তন দল রয়েছে। এসব দল শুধু নাম জপ অনুষ্ঠানে নয়, বিভিন্ন ধর্মীয় উৎসব, খ্রিষ্টযাগ, পারিবারিক প্রার্থনা, আশীর্বাদ অনুষ্ঠান এবং আধ্যাত্মিক সভা-সমাবেশে নিয়মিত অংশগ্রহণ করে। ফলে কীর্তন শুধু সংগীত নয়; এটি স্থানীয় খ্রিষ্টীয় সংস্কৃতি, লোকঐতিহ্য, সামাজিক সংহতি এবং বিশ্বাসের গুরুত্বপূর্ণ বাহক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।
কীর্তনের অর্থ ও ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট
‘কীর্তন’ শব্দটি সংস্কৃত ‘কীর্ত’ ধাতু থেকে উদ্ভূত, যার অর্থ মহিমা বর্ণনা করা, গুণগান করা বা প্রশংসা করা। ‘সঙ্কীর্তন’ শব্দের অর্থ সমবেতভাবে ঈশ্বরের নামগান করা। ভারতীয় ভক্তি আন্দোলনের ইতিহাসে কীর্তনের গুরুত্বপূর্ণ স্থান রয়েছে। প্রখ্যাত সংস্কৃত কবি জয়দেবের গীতগোবিন্দ কীর্তন ধারার বিকাশে বিশেষ ভূমিকা পালন করেছে বলে গবেষকরা মনে করেন। পরবর্তীকালে খ্রিষ্টীয় সম্প্রদায়ও স্থানীয় সংস্কৃতির সঙ্গে সংলাপের মাধ্যমে কীর্তন ধারাকে গ্রহণ করে। ফলে যীশু খ্রিষ্ট, পবিত্র আত্মা, পবিত্র মারীয়া এবং বিভিন্ন সাধু-সাধ্বীর জীবন ও আধ্যাত্মিক বার্তা কীর্তনের মাধ্যমে মানুষের কাছে পৌঁছে যেতে থাকে।
সংরক্ষণ প্রয়োজন একটি অমূল্য উত্তরাধিকার
‘প্রভু যীশুর নাম জপ’ শুধু একটি ধর্মীয় অনুষ্ঠান নয়; এটি বৃহত্তর কুষ্টিয়া অঞ্চলের খ্রিষ্টান সমাজের ইতিহাস, সংস্কৃতি, সংগীত এবং বিশ্বাসের এক অমূল্য উত্তরাধিকার। বিশ্বায়ন ও আধুনিকতার প্রবল স্রোতে অনেক লোকজ ঐতিহ্য হারিয়ে যাচ্ছে। তাই এই নাম জপ কীর্তনকে গবেষণা, নথিভুক্তকরণ এবং সাংস্কৃতিক সংরক্ষণের আওতায় আনা প্রয়োজন। কারণ এর মধ্যে লুকিয়ে আছে স্থানীয় খ্রিষ্টান সমাজের সংগ্রাম, বিশ্বাস, ভক্তি এবং যীশু খ্রিষ্টের প্রতি গভীর প্রেমের ইতিহাস আজও যখন রাতের নীরবতা ভেঙে সমবেত কণ্ঠে ধ্বনিত হয়- “প্রভু যীশু, প্রভু যীশু, প্রভু যীশুর নাম জপ…” তখন মনে হয়, এটি কেবল একটি গান নয়; এটি বৃহত্তর কুষ্টিয়া অঞ্চলের খ্রিষ্টীয় আত্মপরিচয়ের এক চিরন্তন সুর, যা প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে বয়ে চলেছে অবিরাম।



















