Dhaka , মঙ্গলবার, ০৪ অগাস্ট ২০২৬, ১৯ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
শিরোনাম :
‘সেবাকাল-২০২৬’ এর সমাপনী অনুষ্ঠান, পবিত্র খ্রিষ্টযাগ ও মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত ‘সেবাকাল-২০২৬’ এর সমাপনী অনুষ্ঠান, পবিত্র খ্রিষ্টযাগ ও মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত শুলপুর ধর্মপল্লীতে সোসাইটির শিক্ষা সেমিনার, নিজস্ব ভবনের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন ও বৃক্ষরোপণ কর্মসূটি পালন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এ আই) ‘আমাদের প্রতিবন্ধকতা হল সত্যকে অনুধাবন করা।’ সোসাইটির বৃক্ষরোপণ ও গাছের চারা বিতরণ কর্মসূচি ধরেণ্ডায় ২৭তম বার্ষিক বিজ্ঞান মেলা ও পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠান অবশেষে পদত্যাগ করলেন ভারতের শিক্ষামন্ত্রী রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দিনের পদত্যাগপত্র গ্রহণ, ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব নিলেন স্পিকার ভারতে শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের মাঝেই মোদির নতুন ঘোষণা অষ্ট্রেলিয়ার সিডনিতে শুরু হয়েছে বিশ্ব ক্রেডিট ইউনিয়ন সম্মেলন

ট্রাম্প শুরু করেন, শেষ করতে পারেন না…

রিপোর্ট: নীড় সংবাদ ডেস্ক

ডোনাল্ড ট্রাম্প

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের অস্থির ও মতিচ্ছন্ন ব্যক্তিত্ব নিয়ে শুধু যুক্তরাষ্ট্রেই নয়, সারা বিশ্বেই বিস্তর আলোচনা হয়েছে। তাঁর স্বভাব, সিদ্ধান্ত নেওয়ার ধরন, শাসনপদ্ধতি—সবই বহুবার বিশ্লেষণের বিষয় হয়েছে। কিন্তু একটি দিক তুলনামূলকভাবে কম আলোচনায় এসেছে অথচ পররাষ্ট্রনীতি বোঝার জন্য সেটিই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। তা হলো তিনি কাজ শুরু করেন, কিন্তু শেষটা ঠিকমতো করতে পারেন না।

 

বারবার দেখা গেছে, ট্রাম্প হুট করে কোনো উদ্যোগ নেন, বড় কোনো ঘোষণা দিয়ে বসেন, কিন্তু শেষ পর্যন্ত তা বাস্তব রূপ পায় না। মাঝপথে তিনি দিশা বদলে ফেলেন। এর কারণ হতে পারে তাঁর অল্প মনোযোগের স্বভাব, ধারাবাহিকতার অভাব বা ধৈর্যের ঘাটতি। ফলে বহু উদ্যোগই অর্ধেক পথে থেমে যায়।

 

অনেক সময় ট্রাম্প এমন লক্ষ্য স্থির করেন, যা বাস্তবে অর্জন করা কঠিন। পরে যখন বুঝতে পারেন তা সম্ভব নয়, তখনই অন্যদিকে মন ঘুরিয়ে দেন। সমস্যার সমাধান করার বদলে তখন বিষয়টিকে ভবিষ্যতের দিকে ঠেলে দেন। এক নীতি থেকে আরেক নীতিতে হঠাৎ সরে গিয়ে তিনি অনেক বিষয়ই ঝুলিয়ে রাখেন।

 

এর সবচেয়ে স্পষ্ট উদাহরণ গাজা নিয়ে তাঁর শান্তি পরিকল্পনা। সাত মাস আগে তিনি বড় আড়ম্বরে এই পরিকল্পনা ঘোষণা করেছিলেন। কিন্তু নিজের ঘোষিত কুড়ি দফা পরিকল্পনা বাস্তবায়নের বদলে তিনি হঠাৎ ইসরায়েলের সঙ্গে মিলে ইরানের বিরুদ্ধে আক্রমণে জড়িয়ে পড়েন। ফলে গাজা পরিকল্পনা কার্যত অনিশ্চয়তায় পড়ে যায়।

 

হ্যাঁ, যুদ্ধবিরতি হয়েছে বটে, কিন্তু তা বারবার ভেঙে পড়েছে ইসরায়েলি হামলায়। ২০২৫ সালের অক্টোবর থেকে কার্যকর হওয়া যুদ্ধবিরতির পরও সাত শতাধিক ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। গাজার অর্ধেকের বেশি এলাকা এখন ইসরায়েলের দখলে। এমনকি ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু গাজার ৭০ শতাংশ এলাকা দখল করতে নির্দেশ দিয়েছেন।

 

ট্রাম্পের পরিকল্পনায় ইসরায়েলি সেনা প্রত্যাহারের কথা থাকলেও তা কখনো শুরুই হয়নি। বহু পর্যায়ের যে পরিকল্পনার কথা বলা হয়েছিল, তা প্রথম ধাপের গণ্ডিই পেরোয়নি। আন্তর্জাতিক স্থিতিশীলতা বাহিনী গঠনের কথা থাকলেও তা গড়ে ওঠেনি, মোতায়েন তো দূরের কথা। ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে গঠিত তথাকথিত ‘বোর্ড অব পিস’ নিয়েও এখন আর বিশেষ কিছু শোনা যায় না।

 

ট্রাম্প একে বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সংস্থা বলে বর্ণনা করেছিলেন। গাজা পুনর্গঠনের দায়িত্ব তাঁর ওপর ছিল, কিন্তু সেই কাজও শুরু হয়নি; বরং নানা আইনি ও রাজনৈতিক জটিলতায় সংস্থাটি জড়িয়ে পড়েছে—এমন খবরই পাওয়া যাচ্ছে। তহবিলেও অর্থের অভাব। ‘নিউ গাজা’ গড়ে তোলার যে স্বপ্ন দেখানো হয়েছিল (যেখানে এই অঞ্চলকে মধ্যপ্রাচ্যের রিভিয়েরা বানানো হবে বলে বলা হয়েছিল), তা এখন সম্পূর্ণ অনিশ্চিত। এরই মধ্যে গাজার মানুষ ভয়াবহ মানবিক সংকটের মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন।

 

ট্রাম্পের আর একটি অসমাপ্ত উদ্যোগ হলো ইউক্রেন যুদ্ধ থামানোর চেষ্টা। এ যুদ্ধ এখন চতুর্থ বছরে পড়েছে। যদিও মধ্যপ্রাচ্যের সংকটের আড়ালে তা অনেকটাই ঢাকা পড়ে গেছে। ট্রাম্প একসময় বলেছিলেন, তিনি ২৪ ঘণ্টার মধ্যে এ যুদ্ধ শেষ করে দিতে পারবেন। প্রথমে তিনি ইউক্রেনকে এমন একটি প্রস্তাব মানতে চাপ দেন, যা রাশিয়ার পক্ষে যায়। তিনি বলেন, ইউক্রেনের হাতে কোনো তাস নেই। কিন্তু কিয়েভ তা মানতে অস্বীকার করলে ২০২৫ সালের ডিসেম্বর মাসে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউক্রেনের মধ্যে কুড়ি দফার একটি শান্তি পরিকল্পনা হয়।

 

কিন্তু এর পর থেকে ট্রাম্প বারবার ইউক্রেনের নেতৃত্বকে অপমান করেছেন, সামরিক সহায়তা স্থগিত রেখেছেন, নিজের অবস্থান বদলেছেন। যদিও তিনি কিয়েভের সঙ্গে খনিজ সম্পদ নিয়ে চুক্তি করেন। তবু রাশিয়ার বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞার হুমকি দিয়ে তা কার্যকর করেননি। ট্রাম্প কখনো আলোচনা শুরু করেছেন, কখনো থামিয়ে দিয়েছেন। আবার কখনো ত্রিপক্ষীয় বৈঠকের মাধ্যমে রাশিয়া ও ইউক্রেনের মধ্যে সমঝোতার চেষ্টা করেছেন।

 

২০২৫ সালের আগস্টে আলাস্কায় রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গে তাঁর বৈঠক ঘিরে অনেক আশা তৈরি হয়েছিল। মনে করা হয়েছিল, অন্তত যুদ্ধবিরতি হতে পারে। ট্রাম্প নিজেই সেই প্রত্যাশা বাড়িয়েছিলেন, কিন্তু কোনো ফল হয়নি। পরে তিনি বলেন, যুদ্ধবিরতি নয়, সরাসরি স্থায়ী শান্তিচুক্তিই বেশি কার্যকর। কিন্তু সেই আলোচনাও এগোয়নি। ফেব্রুয়ারিতে আলোচনা থমকে যায়।

 

ইউক্রেনের মতে, ট্রাম্প প্রশাসন পুতিনের ওপর চাপ তৈরি করতে আগ্রহী নয়। পরে চীন সফরে যাওয়ার আগে ট্রাম্প আবার বলেন, সমাধান খুব কাছাকাছি। কিন্তু রাশিয়া জানিয়ে দেয়, তেমন কোনো পরিষ্কার পরিকল্পনা নেই। গত মাসে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও স্বীকার করেন, শান্তিপ্রক্রিয়া স্থবির হয়ে গেছে এবং অনন্তকাল ধরে নিষ্ফল বৈঠকে যুক্তরাষ্ট্র আগ্রহী নয়।

 

এ পরিস্থিতিতে ইউক্রেন যুদ্ধ চলছেই। দুই পক্ষই আলোচনায় আস্থা হারিয়েছে। ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি ট্রাম্পের ওপর থেকে আস্থা হারিয়েছেন বলেই মনে করা হচ্ছে। ফলে দ্রুত ও সহজে যুদ্ধ শেষ করার যে প্রতিশ্রুতি ট্রাম্প দিয়েছিলেন, তা অপূর্ণই রয়ে গেছে।

 

এখন বিশ্বের নজর ইরান যুদ্ধের দিকে। প্রশ্ন উঠছে—ট্রাম্প কি এ সংঘাতের শেষ টানতে পারবেন, নাকি এখানেও দীর্ঘস্থায়ী অচলাবস্থা তৈরি হবে? আপাতত পরিস্থিতি ‘না যুদ্ধ, না শান্তি’ অবস্থায় আটকে আছে। এ অবস্থায় রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক খরচ বাড়তেই থাকবে। আগের মতো মাঝপথে সরে যাওয়া এবার ট্রাম্পের পক্ষে সহজ হবে না। কারণ, এখানে সমাধান বলতে শুধু অস্থায়ী যুদ্ধবিরতি নয়, স্থায়ী চুক্তি প্রয়োজন।

 

এই ধারাবাহিক অসমাপ্ত উদ্যোগের ফল মারাত্মক। আন্তর্জাতিক স্তরে যুক্তরাষ্ট্রের বিশ্বাসযোগ্যতা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। মিত্রদেশগুলোর মনে সন্দেহ তৈরি হচ্ছে—যুক্তরাষ্ট্র কি আদৌ নির্ভরযোগ্য? অন্যদিকে প্রতিদ্বন্দ্বী দেশগুলো আরও কঠোর অবস্থান নিচ্ছে। তারা অপেক্ষা করতে শিখছে। তারা জানে, সময় গেলে যুক্তরাষ্ট্র নিজেই অন্যদিকে মন দেবে। ফলে যুক্তরাষ্ট্রের কূটনৈতিক অবস্থান দুর্বল হয়ে পড়ছে।

 

যখন কোনো দেশ শুরু করা কাজ শেষ করতে পারে না, তখন তার বিশ্বাসযোগ্যতা কমে যায়। আর আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে বিশ্বাসযোগ্যতা হারানো মানে শক্তি হারানো। ট্রাম্পের অসমাপ্ত উদ্যোগগুলোই সেই সংকটকে আরও স্পষ্ট করে তুলছে।

 

  • মালিহা লোধি যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও রাষ্ট্রসংঘে পাকিস্তানের সাবেক রাষ্ট্রদূত
  • ডন থেকে নেওয়া, ইংরেজি থেকে অনূদিত
Tag :

Please Share This Post in Your Social Media

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information
Update Time : ১২:৩৮ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ৩ জুন ২০২৬

ট্রাম্প শুরু করেন, শেষ করতে পারেন না…

Update Time : ১২:৩৮ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ৩ জুন ২০২৬

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের অস্থির ও মতিচ্ছন্ন ব্যক্তিত্ব নিয়ে শুধু যুক্তরাষ্ট্রেই নয়, সারা বিশ্বেই বিস্তর আলোচনা হয়েছে। তাঁর স্বভাব, সিদ্ধান্ত নেওয়ার ধরন, শাসনপদ্ধতি—সবই বহুবার বিশ্লেষণের বিষয় হয়েছে। কিন্তু একটি দিক তুলনামূলকভাবে কম আলোচনায় এসেছে অথচ পররাষ্ট্রনীতি বোঝার জন্য সেটিই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। তা হলো তিনি কাজ শুরু করেন, কিন্তু শেষটা ঠিকমতো করতে পারেন না।

 

বারবার দেখা গেছে, ট্রাম্প হুট করে কোনো উদ্যোগ নেন, বড় কোনো ঘোষণা দিয়ে বসেন, কিন্তু শেষ পর্যন্ত তা বাস্তব রূপ পায় না। মাঝপথে তিনি দিশা বদলে ফেলেন। এর কারণ হতে পারে তাঁর অল্প মনোযোগের স্বভাব, ধারাবাহিকতার অভাব বা ধৈর্যের ঘাটতি। ফলে বহু উদ্যোগই অর্ধেক পথে থেমে যায়।

 

অনেক সময় ট্রাম্প এমন লক্ষ্য স্থির করেন, যা বাস্তবে অর্জন করা কঠিন। পরে যখন বুঝতে পারেন তা সম্ভব নয়, তখনই অন্যদিকে মন ঘুরিয়ে দেন। সমস্যার সমাধান করার বদলে তখন বিষয়টিকে ভবিষ্যতের দিকে ঠেলে দেন। এক নীতি থেকে আরেক নীতিতে হঠাৎ সরে গিয়ে তিনি অনেক বিষয়ই ঝুলিয়ে রাখেন।

 

এর সবচেয়ে স্পষ্ট উদাহরণ গাজা নিয়ে তাঁর শান্তি পরিকল্পনা। সাত মাস আগে তিনি বড় আড়ম্বরে এই পরিকল্পনা ঘোষণা করেছিলেন। কিন্তু নিজের ঘোষিত কুড়ি দফা পরিকল্পনা বাস্তবায়নের বদলে তিনি হঠাৎ ইসরায়েলের সঙ্গে মিলে ইরানের বিরুদ্ধে আক্রমণে জড়িয়ে পড়েন। ফলে গাজা পরিকল্পনা কার্যত অনিশ্চয়তায় পড়ে যায়।

 

হ্যাঁ, যুদ্ধবিরতি হয়েছে বটে, কিন্তু তা বারবার ভেঙে পড়েছে ইসরায়েলি হামলায়। ২০২৫ সালের অক্টোবর থেকে কার্যকর হওয়া যুদ্ধবিরতির পরও সাত শতাধিক ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। গাজার অর্ধেকের বেশি এলাকা এখন ইসরায়েলের দখলে। এমনকি ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু গাজার ৭০ শতাংশ এলাকা দখল করতে নির্দেশ দিয়েছেন।

 

ট্রাম্পের পরিকল্পনায় ইসরায়েলি সেনা প্রত্যাহারের কথা থাকলেও তা কখনো শুরুই হয়নি। বহু পর্যায়ের যে পরিকল্পনার কথা বলা হয়েছিল, তা প্রথম ধাপের গণ্ডিই পেরোয়নি। আন্তর্জাতিক স্থিতিশীলতা বাহিনী গঠনের কথা থাকলেও তা গড়ে ওঠেনি, মোতায়েন তো দূরের কথা। ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে গঠিত তথাকথিত ‘বোর্ড অব পিস’ নিয়েও এখন আর বিশেষ কিছু শোনা যায় না।

 

ট্রাম্প একে বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সংস্থা বলে বর্ণনা করেছিলেন। গাজা পুনর্গঠনের দায়িত্ব তাঁর ওপর ছিল, কিন্তু সেই কাজও শুরু হয়নি; বরং নানা আইনি ও রাজনৈতিক জটিলতায় সংস্থাটি জড়িয়ে পড়েছে—এমন খবরই পাওয়া যাচ্ছে। তহবিলেও অর্থের অভাব। ‘নিউ গাজা’ গড়ে তোলার যে স্বপ্ন দেখানো হয়েছিল (যেখানে এই অঞ্চলকে মধ্যপ্রাচ্যের রিভিয়েরা বানানো হবে বলে বলা হয়েছিল), তা এখন সম্পূর্ণ অনিশ্চিত। এরই মধ্যে গাজার মানুষ ভয়াবহ মানবিক সংকটের মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন।

 

ট্রাম্পের আর একটি অসমাপ্ত উদ্যোগ হলো ইউক্রেন যুদ্ধ থামানোর চেষ্টা। এ যুদ্ধ এখন চতুর্থ বছরে পড়েছে। যদিও মধ্যপ্রাচ্যের সংকটের আড়ালে তা অনেকটাই ঢাকা পড়ে গেছে। ট্রাম্প একসময় বলেছিলেন, তিনি ২৪ ঘণ্টার মধ্যে এ যুদ্ধ শেষ করে দিতে পারবেন। প্রথমে তিনি ইউক্রেনকে এমন একটি প্রস্তাব মানতে চাপ দেন, যা রাশিয়ার পক্ষে যায়। তিনি বলেন, ইউক্রেনের হাতে কোনো তাস নেই। কিন্তু কিয়েভ তা মানতে অস্বীকার করলে ২০২৫ সালের ডিসেম্বর মাসে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউক্রেনের মধ্যে কুড়ি দফার একটি শান্তি পরিকল্পনা হয়।

 

কিন্তু এর পর থেকে ট্রাম্প বারবার ইউক্রেনের নেতৃত্বকে অপমান করেছেন, সামরিক সহায়তা স্থগিত রেখেছেন, নিজের অবস্থান বদলেছেন। যদিও তিনি কিয়েভের সঙ্গে খনিজ সম্পদ নিয়ে চুক্তি করেন। তবু রাশিয়ার বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞার হুমকি দিয়ে তা কার্যকর করেননি। ট্রাম্প কখনো আলোচনা শুরু করেছেন, কখনো থামিয়ে দিয়েছেন। আবার কখনো ত্রিপক্ষীয় বৈঠকের মাধ্যমে রাশিয়া ও ইউক্রেনের মধ্যে সমঝোতার চেষ্টা করেছেন।

 

২০২৫ সালের আগস্টে আলাস্কায় রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গে তাঁর বৈঠক ঘিরে অনেক আশা তৈরি হয়েছিল। মনে করা হয়েছিল, অন্তত যুদ্ধবিরতি হতে পারে। ট্রাম্প নিজেই সেই প্রত্যাশা বাড়িয়েছিলেন, কিন্তু কোনো ফল হয়নি। পরে তিনি বলেন, যুদ্ধবিরতি নয়, সরাসরি স্থায়ী শান্তিচুক্তিই বেশি কার্যকর। কিন্তু সেই আলোচনাও এগোয়নি। ফেব্রুয়ারিতে আলোচনা থমকে যায়।

 

ইউক্রেনের মতে, ট্রাম্প প্রশাসন পুতিনের ওপর চাপ তৈরি করতে আগ্রহী নয়। পরে চীন সফরে যাওয়ার আগে ট্রাম্প আবার বলেন, সমাধান খুব কাছাকাছি। কিন্তু রাশিয়া জানিয়ে দেয়, তেমন কোনো পরিষ্কার পরিকল্পনা নেই। গত মাসে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও স্বীকার করেন, শান্তিপ্রক্রিয়া স্থবির হয়ে গেছে এবং অনন্তকাল ধরে নিষ্ফল বৈঠকে যুক্তরাষ্ট্র আগ্রহী নয়।

 

এ পরিস্থিতিতে ইউক্রেন যুদ্ধ চলছেই। দুই পক্ষই আলোচনায় আস্থা হারিয়েছে। ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি ট্রাম্পের ওপর থেকে আস্থা হারিয়েছেন বলেই মনে করা হচ্ছে। ফলে দ্রুত ও সহজে যুদ্ধ শেষ করার যে প্রতিশ্রুতি ট্রাম্প দিয়েছিলেন, তা অপূর্ণই রয়ে গেছে।

 

এখন বিশ্বের নজর ইরান যুদ্ধের দিকে। প্রশ্ন উঠছে—ট্রাম্প কি এ সংঘাতের শেষ টানতে পারবেন, নাকি এখানেও দীর্ঘস্থায়ী অচলাবস্থা তৈরি হবে? আপাতত পরিস্থিতি ‘না যুদ্ধ, না শান্তি’ অবস্থায় আটকে আছে। এ অবস্থায় রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক খরচ বাড়তেই থাকবে। আগের মতো মাঝপথে সরে যাওয়া এবার ট্রাম্পের পক্ষে সহজ হবে না। কারণ, এখানে সমাধান বলতে শুধু অস্থায়ী যুদ্ধবিরতি নয়, স্থায়ী চুক্তি প্রয়োজন।

 

এই ধারাবাহিক অসমাপ্ত উদ্যোগের ফল মারাত্মক। আন্তর্জাতিক স্তরে যুক্তরাষ্ট্রের বিশ্বাসযোগ্যতা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। মিত্রদেশগুলোর মনে সন্দেহ তৈরি হচ্ছে—যুক্তরাষ্ট্র কি আদৌ নির্ভরযোগ্য? অন্যদিকে প্রতিদ্বন্দ্বী দেশগুলো আরও কঠোর অবস্থান নিচ্ছে। তারা অপেক্ষা করতে শিখছে। তারা জানে, সময় গেলে যুক্তরাষ্ট্র নিজেই অন্যদিকে মন দেবে। ফলে যুক্তরাষ্ট্রের কূটনৈতিক অবস্থান দুর্বল হয়ে পড়ছে।

 

যখন কোনো দেশ শুরু করা কাজ শেষ করতে পারে না, তখন তার বিশ্বাসযোগ্যতা কমে যায়। আর আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে বিশ্বাসযোগ্যতা হারানো মানে শক্তি হারানো। ট্রাম্পের অসমাপ্ত উদ্যোগগুলোই সেই সংকটকে আরও স্পষ্ট করে তুলছে।

 

  • মালিহা লোধি যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও রাষ্ট্রসংঘে পাকিস্তানের সাবেক রাষ্ট্রদূত
  • ডন থেকে নেওয়া, ইংরেজি থেকে অনূদিত